কীর্তনখোলা নদীর ছেলে আল আমিন বাবু - বিডি বুলেটিন কীর্তনখোলা নদীর ছেলে আল আমিন বাবু - বিডি বুলেটিন

শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৫ অপরাহ্ন

কীর্তনখোলা নদীর ছেলে আল আমিন বাবু

কীর্তনখোলা নদীর ছেলে আল আমিন বাবু

ভায়লেট হালদার:

মায়ের কোলে মায়ের কণ্ঠে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া আর সকাল বেলা বড়বোনের হারমোনিয়ামের সাথে গলা সাধা ছিল শৈশবে রোজকার অভ্যাস। মুখের কথা কথা স্পষ্ট স্বরে শব্দ ফুটে বের হওয়ার আগেই কন্ঠে ধারণ করেছিল সুর। কৈশোরে হাতে তুলে নিয়েছিলে গিটার এবং এই গিটারকে বন্ধুর মতোই আগলে রাতদিন কাটতো তার। এই গিটারকে বন্ধুর মতই আগলে রেখেছেন আজ অবধি। নদীর ঢেউয়ের আছড়ে পড়া শব্দে সুর খুঁজত, মনে ভেতরে বুনতো শব্দের মালা। তখন কে জানতো বরিশালের এই ডানপিটে, সদালাপি, অমায়িক ছেলেটি একদিন গানের মধ্য দিয়েই মানুষের অন্তরের অত্যন্ত কাছের একজন হবে!

কীর্তনখোলা নদী রে আমার……… শৈশবের স্মৃতিচারণ ‘চাইম’ এর বিখ্যাত গান।
আশির দশকে এই গানটির সুর বরিশাল ছাপিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের অন্তর ছুঁয়েছিল। জন্মস্থানের জন্য যে টান ও ভালবাসা, সেই সাথে শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিচারণ যেন গানের প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও সুরে আন্দোলিত হয়েছিল। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় গানের গীতিকার ও সুরকার আমাদের বরিশালের সন্তান আল আমিন বাবু। বরিশালের বগুড়া রোডের পেশকার বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন। পোশাকী নাম মহিউদ্দিন শফিকউল্লাহ হলেও তিনি আল আমিন বাবু নামেই সকলের কাছে সুপরিচিত। তিনি একজন গীতিকার, সুরকার ও গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে। বর্তমানে তিনি আমেরিকায় প্রবাস জীবন যাপন করছেন। সেখানে তিনি মানুষের মাঝে বাংলাদেশের গান ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি ওখানাকার শিশু, কিশোর ও তরুণদের গিটার ও বাংলা গানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এই প্রজন্ম যারা বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছে তারা যেন বাংলা ভাষা ভুলে না যায় এবং নিজের দেশ বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসতে পারে, সেই লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি নিজেকে বঙ্গবন্ধুর আত্মিক সন্তান হিসেবে দাবী করেন।

আল আমিন বাবুর বড় চাচা ইমাদুল্লাহ লালা ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ ও ভাষা সৈনিক। ঢাকা বিশ্ববিদালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি বামপন্থী ছাত্ররাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাব জড়িয়ে পড়েন এবং তৎকালীন কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য হন এবং তখন তাকে সবাই কমরেড লালাভাই বলে সম্বোধন করতো। তিনি ১৯৫০ সালের বরিশালের হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার মূল হোতাদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিলে পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সে সময় তিনি বেশ কিছুদিন জেল খাটেন। তৎকালীন পাকিস্তানী সরকার কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ বা ইয়ুথলীগ গঠন করেন এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলনের সময়ে পাকিস্তানী সরকারের রোষানলে তখন অনেক ছাত্র গ্রেপ্তার হলেও তিনি আত্মগোপনে থাকায় গ্রেপ্তার এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন। আত্মগোপনে থেকেই তিনি ছাত্রদের সংগঠিত করতে থাকেন এবং ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভুমিকা পালন করেন। ৫২’ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গনে যে বিশাল জনসভা হয়েছিল তাতে তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন। এরপরে ১৯৫৪ সালে তিনি যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এছাড়াও ৫৪ সালের রেল ধর্মঘট ও যুক্তফ্রন্ট এর সৃষ্টিরও একজন অন্যতম সংগঠক ছিলেন । ১৯৫৬ সালের ৬ই এপ্রিল তিনি মারা যান। এই নেতার মৃতুর পরে শোক প্রকাশে সমগ্র পূর্বপাকিস্তানের স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদালয়ে কালো পতাকা টানানো হয় এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তার ফুপু আয়েশা খাতুন ওরফে বেলা নবী একজন সমাজ সেবক হিসেবে অত্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত এই মহীয়সী নারী একসময় গুলশান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তারই উদ্যোগে গুলশান ক্লাব প্রতিষ্ঠা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তাকে নয়মাস কারাবন্দী থাকতে হয়েছিল। আল আমিন বাবুর পিতা মুক্তিযোদ্ধা ওবায়েদ উল্লাহ ওরফে কায়সার ও মাতা মোশতারী বেগমের আট সন্তানের সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান আল আমিন বাবু। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার বড় ভাই খন্দকার তারেক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

অসংখ্য গানের গীতিকার ও সুরকার আল আমিন বাবু। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে নিহত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তার পরিবারকে নিয়ে গান লিখেছেন, সুর করেছেন।

‘এই শোন আমি তার কথা বলি। হাজার বছরের যে সেরা বাঙালি তুমি চাও না কি জানতে কোথা থেকে এলে, কোথায় যাচ্ছো হে বাঙালি?’

২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এই গানটি তরুণ সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে।

‘আলোর সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছি একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে, আমায় কেন করেছো হত্যা হে বাঙালি বলো কি আমার অপরাধ?’

এই গানটিও ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র নিহত রাসেল স্মরণে লিখেছেন, সুর দিয়েছেন ও গেয়েছেন। এছাড়া দেশের গান, আধুনিক গান, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে এবং বরিশালের আঞ্চলিক গান সহ অসংখ্য গানের কলম সৈনিক, সুর স্রষ্টা ও কণ্ঠযোদ্ধা আল আমিন বাবু।

‘ফ্রিজিং পয়েন্ট’ ব্যান্ড দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্র শুভ্র, যিনি শংকর পুরুস্কার প্রাপ্ত ছিলেন। ১৯৮১ সালে গুলশান ক্লাবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান গেয়ে ‘ফ্রিজিং পয়েন্ট’ ব্যান্ড দলের সঙ্গে যুক্ত হন আল আমিন বাবু ও আশিকুজ্জামান টুলু। এরপরে শুভ্র উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে চলে গেলে ১৯৮৩ সালে বন্ধু আশিকুজ্জামান টুলুকে নিয়ে গঠন করেন ব্যান্ডদল ‘চাইম’। আল আমিন বাবু ১৯৮৮ সালে সালে ‘বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ড এসোসিয়েশন’ এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং জেনারেল সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। এ ছাড়াও তিনি নির্মলেন্দু গুণ সহ অনেকের গীতিকারে গানের সুর করেছেন এবং গান গেয়েছেন। আল আমিন বাবু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সামাজিক আন্দোলন, বাংলাদেশ গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছিলেন।

‘হে নতুন প্রজন্ম তোমরা, যারা জন্মেছো স্বাধীন দেশে। ভেবে দেখেছো কি কোনদিন যারা এ দেশ করেছে স্বাধীন! তাদের কাছে তোমার কি নেই কোন ঋণ? সময় এসেছে সেই ঋণ শোধাবার। কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাও আজ। বিচার চাই, বিচার চাই। নিপাত যাও, নিপাত যাও। যুদ্ধাপরাধী রাজাকারের বিচার চাই।‘

এই গান, সুরের মধ্য দিয়ে তিনি এই প্রজন্মকে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলেছিলেন, সাহস যুগিয়েছিলেন। তার লেখা গান আর সুরে ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের উদ্বোধনী হয়। এছাড়াও তার লেখা ও সুর করা অন্যতম জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে কয়েকটি,

– আমরা বাঙালি বাংলা মোদের গর্ব। ভালবাসা দেবো উজাড় করে বাংলা মায়ের জন্য।
– তুমি আমার বাংলাদেশ।
– দেখেছো কি ভেবে একবার, কার রক্তে রাঙ্গা তোমার হাত! বুকে হাত রেখে বলো তোমার ধর্মে কি এই শিক্ষা ছিল, মানুষকে ভালবাসো, মানুষই ধর্ম, তার উপরে নাই।
– শোন একটা গল্প বলি আজ তোমাদের। সে গল্প গল্প নয়, সে গল্প জীবন থেকে নেয়া আমাদের।
– সবুজের এই দেশ আমাদের প্রিয় দেশ। গুণীজনেদের দেশ আমার এই বাংলাদেশ।

আল আমিন বাবু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সামাজিক সমস্যার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময়ে কলাম লিখেছেন। রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা আল আমিন বাবু বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত একজন নির্ভীক যোদ্ধা বাঙালি।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018