প্রাইমারি স্কুল সমাপনী পরীক্ষার্থীর ফেয়ারওয়েল চাঁদা ‘৭শ’ টাহা - বিডি বুলেটিন প্রাইমারি স্কুল সমাপনী পরীক্ষার্থীর ফেয়ারওয়েল চাঁদা ‘৭শ’ টাহা - বিডি বুলেটিন

মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:৫৩ অপরাহ্ন

প্রাইমারি স্কুল সমাপনী পরীক্ষার্থীর ফেয়ারওয়েল চাঁদা ‘৭শ’ টাহা

প্রাইমারি স্কুল সমাপনী পরীক্ষার্থীর ফেয়ারওয়েল চাঁদা ‘৭শ’ টাহা

রিয়াজ মাহমুদ, বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
‘মাইয়াডার ফেয়ারওয়েল ফি এত টাহা কই পামু। ক্যামনে দিমু ৭শ’ টাহা। মোটরসাইকেলে যাত্রি টাইন্যা সংসার চলে। অর ল্যাহা-পড়ার খরচও চালাই। এ্যাহন ফাইন্যাল পরীক্ষার সময় একটু কোম ধরলে কি অইতে’ এসব কথা ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক রোজ আয়ের মানুষ পটুয়াখালীর বাউফলের ৭০ নং ধানদী বাহাদুরপুর সরকারি প্রাইমারি স্কুলের নুরুল ইসলাম নামে এক অভিভাবকের। এ বছর প্রাইমারি স্কুল সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেবে তার মেয়ে শান্তা। আর ওই স্কুল থেকে শনিবার (৯ নভেম্বর) দেওয়া হবে ফেয়ারওয়েল। অনুষ্ঠানের আগেই পরিশোধ করতে হবে স্কুল নির্ধারিত পরীক্ষার্থীদের মাথাপিছু ৭শ’ টাকা হারে চাঁদা (ফেওয়ারওয়েল ফি)। মেয়ের ফেয়ারওয়েলের চাঁদা পরিশোধে তাই চোখে-মুখে ক্ষোভ আর হতাশার ছাপ স্থানীয় বাজারের এক চাঁয়ের দোকানের সামনে মোটরসাইকেলের যাত্রির অপেক্ষায় থাকা নুরুল ইসলামের। জানা গেছে, আগামি ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে প্রাইমারি স্কুল সমাপনী পরীক্ষা। মোট ২৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেবে ধানদী বাহাদুরপুর সরকারি প্রাইমারি স্কুল থেকে ওই সমাপনী পরীক্ষায়। আগের মতো দাওয়াতি চিঠি ছাপানো না হলেও কমিটির লোকজন মিলে প্রাথমিকভাবে আলোচনা শেষে পরীক্ষার্থীদের বিদায় দিতে শনিবার (৯ নভেম্বর) স্কুলে ডাকা হয়েছে অনুষ্ঠান। সিদ্ধান্ত অনুযায়ি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করাও হচ্ছে ৭শ’ টাকা হারে ফেয়ারওয়েলের চাঁদা। স্কুল সমাপনী পরীক্ষার্থী ফারজানা, তমা, তন্ময়, শান্তাসহ কয়েকজন জানান, ১ম শ্রেণি থেকে ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা হারে। স্থানীয় বাজারের ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ি শঙ্কর বাবু নামে একজন অভিভাবক জানান, স্কুল সমাপনী পরীক্ষার ফি হিসেবে ৬০ টাকা হারে নেওয়ার নিয়ম থাকলেও এর আগেও এসব শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় ১শ’ থেকে দেড়শ’ টাকা হারে। এলাকায় নিজ পরিচিতি তুলে ধরতে স্কুলের সভাপতি তার নিজের খেয়াল-খুঁসি মতো স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে চাঁদা আদায়ের মতো নানা সব উদ্ভট সিন্ধান্ত নেয়। নিজে প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক হওয়ায় স্থানীয়দের থোরাই কেয়ার করেন তিনি। স্কুলে নিম্ম-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে একবারেই উদাসীন তিনি। শিক্ষকরাও তারই মতো যাচ্ছে-তাই। স্কুল টাইমে শ্রেণি কক্ষে নির্ধারিত ক্লাস বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের কোচিং সারেন। হাতিয়ে নেন মোট অঙ্কের টাকা। অনেকে দুপুরের খাবার সারেন বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীদের টিফিন ক্যারিয়ারে আনা খাবারে। সভাপতি আর শিক্ষকদের স্কুল যেন এক পরিচিত বানিজ্য। অভিভাবক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মাইয়াডার পরীক্ষায় বিরুপ অইবে। হ্যাইয়ার লইগ্যা টাহা দেওন লাগবে। মটরসাইকলে এ্যাহন কড়াকড়ি আইন অইছে। সব কাগজ, হেলমেট না থাকলে সদরেও ওঠন যায় না; মোডা জরিমানার ডর। কাগজ করণ লাগবে। মাইয়াডার লইগ্যা ৭শ’ টাহা পামু কই।’ অভিভাবক শঙ্কর বাবুও প্রায় অভিন্ন বলেন, ‘ধার-দেনায় সংসার চলে। সপ্তাহের ঋনের কিস্তি টানন লাগে। কমিটি আর স্যারেগো আমাগো মতোন গরিব মাইনষের পোলাপানের থাইক্যা কোম লওন উচিত।’ পাশের স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষক জানান, সভাপতি ও কমিটির লোকজনের সহোযোগিতায় স্কুল সমাপনী পরীক্ষার্থীদের প্রতিবার বিদায় উপলক্ষে পেন্সিল বক্স, জ্যামিতি বক্স, বোর্ড এসব উপহার সামগ্রী এবং শিক্ষকদের সহোযোগিতায় মিষ্টির আয়োজন করলেও ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কোন রকমের চাঁদা নেন না তারা। নাম প্রকাশ না করলেও কয়েকজন শিক্ষক ও স্থানীয় লোকজন ওই স্কুলের সভাপতি ও শিক্ষকদের আচরণে ক্ষুব্ধ। স্কুলে এধরণের চাঁদা আদায়ের মতো বিধিবর্হিভূত নানা কাজের জন্য পাশের স্কুল হিসেবে তাদের শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মাঝেও দিনদিন বিরুপ প্রভাব পড়ছে। নিজ ছেলেমেয়েদের কাছে ছোট হতে না পেড়ে পাশের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হয়েও একজনের ৭শ’ টাকা চাঁদা পরিশোধের কথাও জানিয়েছেন তিনি। প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলেও পরে সত্যতা স্বীকার করে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আভা রাণী (০১৭৪১৫৬৫০৩৯) বলেন, ‘আমি স্কুলে অল্প কয়েকদিন আগে জয়েন্ট করেছি। সভাপতি ও স্যাররা মিটিংয়ে টাকার বিষয়টি নির্ধারণ করেছেন।
ওই দিন আমি স্কুলে ছিলাম না। এক স্যার কোচিং করিয়েছেন তার বাবদ ও অন্যান্য খরচ হিসেবে টাকা নেওয়া হচ্ছে।’ টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে স্কুল কমিটির সভাপতি মো. দলিল উদ্দিন খান (০১৭১৪২৭২৮৩৯) বলেন, ‘স্যারদের প্রাইভেট ও অন্যান্য খরচ বাবদ টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবছর আমি পকেট থেকে অনেক খরচ করি। এবারেও আরো বাড়তি খবর আমার দেওয়া লাগবে।’ এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রিয়াজুল হক (০১৭১৬৪৫৫২৪৫) বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তদন্ত করে দেখা হবে। ঘটনা সত্য হলে অবশ্যই ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।’

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018