বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও প্রাথমিকের শিক্ষাদান পদ্ধতির সাদৃশ্য - বিডি বুলেটিন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও প্রাথমিকের শিক্ষাদান পদ্ধতির সাদৃশ্য - বিডি বুলেটিন

বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৪৭ অপরাহ্ন

সর্বশেষ সংবাদ :
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার কমিশন বরিশাল মহানগর মহিলা শাখার উদ্যোগে নানা কর্মসূচী পালন আগৈলঝাড়ায় বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি অবমাননা প্রধান শিক্ষকের অপসারন চেয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল, ইউএনও’র তদন্ত কমিটি গঠন আগৈলঝাড়ায় ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস পালন আগৈলঝাড়া উপজেলা আওয়ামীলীগ সাবেক সভাপতি ইউসুফ মোল্লার ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী ত্যাগী নেতাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়া হবে-আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্ পপুলার লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড বার্ষিক ক্লোজিং প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত ইসলামি বই মেলার শুভ উদ্ভোধন উদ্ধার হওয়া ৪০ হাজার ইয়াবা ধ্বংস করা হয়েছে সত্য- মিথ্যা যাচাই আগে ইন্টারনেটে শেয়ার পরে এই প্রতিপাদ্য নিয়ে ভাণ্ডারিয়ায় ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবসের র‌্যালী ছয় বছরে একদিনও ক্লাস করাননি শিক্ষিকা
বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও প্রাথমিকের শিক্ষাদান পদ্ধতির সাদৃশ্য

বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও প্রাথমিকের শিক্ষাদান পদ্ধতির সাদৃশ্য

গুণী সাংবাদিক ও কলামিষ্ট শ্রদ্ধেয় অজয় দাশগুপ্ত জাতীয় দৈনিক সমকালে “অটিষ্টিক শিশুকে সম্মান করহে সমাজ” শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তাতে উল্লেখ করেন;চাকুরির সুবাদে সিডনীতে থাকাকালে তার ঘনিষ্ট ক্রোয়েশিয়ান বন্ধু জোসিফোস্কা তার কিছু কর্মকান্ড দেখে তার মধ্যে না-কি অটিজমের লক্ষণ আছে বলে অনুমান করেছিলেন। কর্মকান্ডগুলোর কথা নাইবা বলি, তবে ঐ ক্রয়োশিয়া মহিলার অটিজম সম্পর্কে কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা/জ্ঞান ছিল কি-না তা আমার জানা নাই। তবে ধারনা করছি, থাকতে পারে। থাকুক বা নাই থাকুক তার ধারণা সঠিক। অজয়দা’ও তার কথার বিরোধিতা করলেন না বরং মেনেই নিলেন। এ থেকে বোঝা যায় তার ও অটিজমসম্পর্কে ধারণা আছে। তাইতো তিনি অকপটে মেনে নিলেন এবং সকল মানুষের মধ্যেই যে কম-বেশী এর লক্ষণ থাকে তা অনুভব করলেন। তার অনুভুতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার নিবন্ধে। অজয়দা যত সহজে ব্যাপারটি মেনে নিলেন বা অনুভব করলেন বা স্বীকার করলেন আমাদের দেশের অনেক মানুষই এটি স্বীকার করতে নারাজ বিশেষ করে মায়েরা একেবারেই নারাজ।
অটিষ্টিক শিশুর সুরক্ষায় অনেক আইন আছে, ক্ষেত্র বিশেষে প্রয়োগও আছে। তবুও বাঁধা কোথায় ? প্রথম বাঁধা পরিবার দ্বিতীয় বাঁধা সমাজ এবং সর্বশেষ বাঁধা রাষ্ট্র। এত বাঁধা পেরিয়ে এরা বিকশিত হবে না, যথাযথ মর্যাদা পাবেনা এটিই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রীয় বাঁধা উত্তরণের জন্য আইন ও এর যথাযথ প্রয়োগই যথেষ্ট কিন্তু সমাজ ও পরিবারের বাঁধাকী আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় ? মোটেই না। এজন্য চাই সচেতনা ও শিক্ষা। তাইতো অজয়দা তার নিবন্ধে অটিষ্টিক শিশুর মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তার লেখায়। ধন্যবাদ অজয়দাকে, তার লেখার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি তিনি অটিষ্টিক শিশুর জন্য সহানুভূতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আবেদনজানিয়েছেন। সকল মানুষের মধ্যেই অটিজমের লক্ষণ কমবেশী থাকতে পারে। অনেকগুণী ও বিখ্যাত মানুষের মধ্যেও এর লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে/জানা যায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনঃ
(১) সাতশি তাজিরি, জন্ম- আগষ্ট ২৮, ১৯৬৫, টোকিও, জাপান। তিনি একজন ভিডিও গেইম ডিজাইনার হিসেবে সুপরিচিত।
(২) মাইকেলেঞ্জেলো দি লোদেভিকো বুওনারোত্তি, জন্ম- মার্চ ৬, ১৪৭৫, তুসকানি, ইতালী। তিনি একজন ইতালীয় ভাস্কর, চিত্রকর, স্থপতি এবং কবি।
(৩) স্যার আইজ্যাক নিউটন, জন্ম- জানুয়ারী ৪, ১৬৪৩ লিংকনশায়ার, ইংল্যান্ড। তিনি একজন ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, প্রাকৃতিক দার্শনিক, আলকেমিষ্ট এবং প্রভাবশালী বিজ্ঞানী।
(৪) গ্যারি নিউম্যান, জন্ম- মার্চ ৮, ১৯৫৮ পশ্চিম লন্ডন, যুক্তরাজ্য। তিনি একজন ইংরেজ গায়ক, গীতিকার ও সুরকার।
(৫) অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, জন্ম- মার্চ ১৪, ১৮৭৯ উলম, উরটেমবার্গ, জার্মানী। তিনি একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী।
(৬) ম্যাথিউ লেবোরটিয়াক্স, জন্ম- ডিসেম্বর ৮, ১৯৬৬ ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র। তার শুরুটা হয়েছিল টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র অভিনয় দিয়ে। তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পান এনবিসি টেলিভিশনে ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত প্রচারিত ধারাবাহিক ‘লিট্ল হাউস অন দ্যা প্রেইরী’-এর ‘আলবার্ট কুইন ইঙ্গল্স’চরিত্রটির জন্য।
(৭) লুডউইগ ভ্যান বিথোভেন, জন্ম- ডিসেম্বর ১৭, ১৭৭০ বন, জার্মানি। তিনি ছিলেন একজন জার্মানসুরকার ও পিয়ানোবাদক। তাঁকে সর্বকালের শেষ্ঠ সুরকারদের একজন মনে করা হয়। তাঁর খ্যাতি ও প্রতিভা পরবর্তী প্রজন্মের সুরকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও শ্রোতাদের অনুপ্রাণিত করেছে।
(৮) আডলফ্ হিটলার, জন্ম- এপ্রিল ২০, ১৮৮৯, অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত বিতর্কিত জার্মান রাজনীতিবিদ। তিনি একটি সমগ্রতাবাদী ও ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানরা পোল্যান্ড অধিকার করে এবং ফলশ্রæতিতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।
(৯) টমাস আলভা এডিসন, জন্ম- ফেব্রুয়ারী ১১, ১৮৪৭, মিলান, ওহাইও। তিনি গ্রামোফোন, ভিডিও ক্যামেরা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈদ্যুতিক বাতি (বাল্ব)সহ বহু যন্ত্র তৈরী করেছিলেন।
(১০) উলফগ্যাঙ অ্যামাডিয়্যুস মোৎজার্ট, জন্ম- জানুয়ারী ২৭, ১৭৫৬, জালৎস্বুর্গ, অস্ট্রিয়া। প্রভাবশালী সংগীতজ্ঞ, তিনি সিম্ফনি শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত।
(১১) এমিলি এলিজাবেথ ডিকেনসন, জন্ম- ডিসেম্বর ১০, ১৮৩০ আমহর্স্ট, ম্যসাচুসেটস। তিনি একজন মার্কিন কবি ও তিনি সকলের কাছে সাদা কাপড় পরিহিতা বলে চরিচিত ছিলেন।
(১২) ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগ, জন্ম- মার্চ ৩০, ১৮৫৩, নর্থ ব্রাবান্ট, নেদারল্যান্ড। তিনি একজন ওলন্দাজ চিত্রকর।

এমনকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্যেও এ লক্ষণ আছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও পৃথীবিতে সকল বিজ্ঞানীদের মধ্যেও এ লক্ষণ কিছুটা হলেও ছিল বলে ধারনা করা হচ্ছে। এজন্যই বোধ হয় অজয়দা এদের প্রতি সম্মান দেখাতে বলেছিলেন। কেননা এদের মাঝে হয়ত এমন প্রতিভা লুকিয়ে আছে যারা উপযুক্ত সহায়তা, সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধা পেলে হতে পারবেন জগৎ বিখ্যাত কোন মানুষ। ঢাকা মিরপুরের কোন এক বস্তিতে বেড়ে ওঠা রিক্সাওয়ালার মেয়ে শিউলিও হতে পারে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অতিমাত্রায় অটিজম নিয়ে বেড়ে ওঠা দরিদ্র শিউলী কথা বলতে পারতো না, চলতে পারতোনা, মায়ের মুখাপেক্ষী হয়েই কেটে যাচ্ছিল শৈশব। সেও ২০১৪ সালের স্পেশাল অলিম্পিক এ ৩টি স্বর্ণ পদক জয় করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল করেছিল। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় স্পেশাল অলিম্পিকে বাংলাদেশ এখন শীর্ষে রয়েছে এটি নিঃসন্দেহে আশার কথা। এ বিষয়ে সরকারের প্রচেষ্টা ও আমাদের সাফল্যে অজয়দা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন বলে আশা করি। ২০১১ সালে বিশ্ব অটিজম সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়েই মূলতঃ এদেশের সাধারণ মানুষ এ শব্দটির সহিত পরিচিত হয়েছে এবং সচেতন মহলে কিছুটা ঝাঁকুনি দেয় এ সম্মেলন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নিরলস প্রচেষ্টা ও প্রতিবেশী বন্ধু প্রতীম দেশ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেস নেতা সোনিয়াগান্ধীর আন্তরিকতাই মূলতঃ এ সম্মেলনকে অর্থবহ করে তোলে। বিভিন্ন আইন, দাতা দেশগুলোর চাহিদা এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতার ফলে বাংলাদেশ এ বিষয়ে যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তারই ধারাবাহিকতায় সম্ভবতঃ বাংলাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক বিভাগের প্রবর্তন হয়। ১৯১২ সালে ইতালির বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী মারিয়া মন্তেসরী প্রবর্তিত শিক্ষাদান পদ্ধতি বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাধারণ শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গঠিত জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারই সর্বপ্রথম বাংলাদেশে এ পদ্ধতি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে শিশুর অধিকার বিকাশের লক্ষ্যে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে এবং এ শাখার জন্য আলাদা শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ শাখার জন্য আলাদা শ্রেণী কক্ষ ও বিশেষ শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থাও রয়েছে। এ শাখার শিক্ষকদের জন্য urc মাধ্যমে রয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণ। কিন্তু urc’র মাধ্যমে যারা এ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মত কোন প্রতিষ্ঠাানিক শিক্ষা নেই, থাকার কথাও নয়। বিশেষ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিলে প্রাক-প্রাথমিক বিভাগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। মারিয়া মন্তেসরীর শিক্ষাদান পদ্ধতি একটি স্ব-শিক্ষা পদ্ধতি। কারণ এ ক্ষেত্রে শিশুরা নিজেরা সক্রিয় হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে। তিনি মনে করেন, শিক্ষক বা বিদ্যালয় সরাসরি শিশুদের শিক্ষাদান করতে পারে না বরং তারা শুধু শিশুকে এমন একটি পরিবেশ তৈরী করে দিতে পারেন, যা শিশু শিক্ষার জন্য উপযোগী। শিশুরা সাধারণত শিখতে চায় এবং তাদের নিজের দক্ষতা উন্নয়নের সহজাত প্রবণতা আছে এমন অনুমানের উপর তার মতবাদ প্রতিষ্ঠিত। এ প্রেক্ষিতে দেখা যায় তার শিক্ষাদান পদ্ধতি আধুনিক মুক্ত শ্রেণী কক্ষের অনুরূপ যেখানে শিশুরা তাদের পছন্দ অনুসারে বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিয়োজিত হয় এবং শিক্ষক নির্দেশক না হয়ে সহায়কের ভূমিকায় থাকেন।

মারিয়া মন্তেসরী পদ্ধতি/ Auto Educational Method
মারিয়া মন্তেসরী ছিলেন একজন ইতালিয়ান। তৎকালীন প্রখ্যাত চিকিৎসকদ্বয় ইতরাদ ও সেগুইন কর্তৃক অনুসৃত ক্ষীণ বুদ্ধি ও ত্রুটি সম্পন্ন ছেলে-মেয়েদের চিকিৎসায় অভিনব পদ্ধতি দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, এই পদ্ধতি শিশুদের শিক্ষণের ক্ষেত্রে ভালো ফল দিতে পারে। এই বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তার কর্মজীবনে শিক্ষাদান পদ্ধতির উন্নতি ও সংস্কারে ব্রতী ছিলেন। বিশেষ করে তিনি তার শিক্ষণ পদ্ধতিতে নানা দিক থেকে নতুনত্ব এনেছেন। তার শিক্ষণ পদ্ধতি প্রধানতঃ ৩টি মূল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। (১) ইন্দ্রিয় পরিমার্জনের নীতি(২) সক্রিয়তার নীতি(৩) স্বাধীনতার নীতি

# ইদ্রিয় পরিমার্জনের নীতি ঃ এ বিষয়ের উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন যে, মানসিক অনগ্রসরতার জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী হলো ইন্দ্রিয়। ইন্দিয়ের মাধ্যমে আমরা বর্হিজগৎ থেকে জ্ঞান আহরণ করি এবং এই ইন্দ্রিয়ের অক্ষমতার দরুন মানসিক অনগ্রসরতা দেখা দেয়। তাই তিনি মনে করেন শিশুকে শিক্ষা দিতে হলে প্রথমে তার ইন্দ্রিয়ের উৎকর্ষ সাধন করতে হবে। ইন্দ্রিয়ের উৎকর্ষ সাধনের জন্য তিনি বিভিন্ন ধরনের  Didactic Apparatus বা শিক্ষা মূলক সাজ সরঞ্জাম তৈরী করেন, যার মাধ্যমে শিশু সহজেই বিভিন্ন ধরনের উদ্দীপকের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে।

# সক্রিয়তার নীতি ঃ তিনি শিশুর আত্মপ্রচেষ্টার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন শিক্ষার্থীরা যখন নিজের চেষ্টায় কোন বিষয় শিখবে তখন তারা কাজের মধ্য দিয়ে আনন্দ পেয়েই শিখবে। আর এটাই হতে পারে তার প্রকৃত শিক্ষা। এতে করে সব রকমের মানসিক ক্ষমতা সম্পন্ন শিক্ষার্থীকে সহজে শিক্ষাদান করা যায়। এই প্রকার শিক্ষা পদ্ধতিকে তিনি স্বয়ং শিক্ষা বা Auto Education বলেছেন।

# স্বাধীনতার নীতিঃ শিক্ষার্থীকে স্বয়ং শিক্ষার সুযোগ দিতে হলে তাকে অবাধ স্বাধীনতা দিতে হবে। মন্তেসরীর মতে শিক্ষা হলো আত্ম ক্ষমতার বিকাশ। যে কোন ক্ষমতার বিকাশ পরিপূর্ণভাবে করতে হলে শিশুকে কাজ করার অবাধ স্বাধীনতা দিতে হবে। তিনি এই স্বাধীনতাকে শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আর এ থেকে জন্ম নিয়েছে তার প্রসিদ্ধ স্বয়ং শিক্ষা পরিকল্পনা।
মন্তেসরীর শিক্ষা পদ্ধতি অনুযায়ী সার্থকভাবে শিক্ষা পরিচালনা করতে হলে শিক্ষার্থীর ইন্দ্রিয়ের পরিমার্জন করতে হবে। ইন্দিয়ের পরিমার্জনের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে আহরণের জন্য অবাধ স্বাধীনতা দিতে হবে। মন্তেসরীর এই পদ্ধতিতে কোন তাত্তি¡ক আলোচনা করেননি। তিনি ছয় বছর পর্যন্ত শিশুদের শিক্ষার জন্য নিমোক্ত ধরনের অনুশীলনের কথা উল্লেখ করেন।

 জীবন উপযোগী কাজের অনুশীলনঃতিনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের জন্য কিছু সাধারণ কাজের অনুশীলনের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দাঁত ব্রাশ করা, নখ কাটা, কাপড় কাঁচা, ঘর পরিস্কার করা, আসবাবপত্র পরিস্কার করা ইত্যাদি। তার মতে পরনির্ভরশীলতা স্বাধীনতার অন্তরায়। তাই শিশুদের যানবাহনে উঠতে শেখানো, বাজার করা, Traffic Signal  মেনে চলতে শেখানো এরূপ অনেক Basic Skills আছে যা শিশুকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার জন্য তিনি তাদের এসব কাজ শেখানোর কথা উল্লেখ করেছেন।তাছাড়া এই কাজের মাধ্যমে শিশুর দেহের পেশী সঞ্চালনের জন্য কিছু কাজ হয় বলে মনে করেন। এই সব কাজের মাধ্যমে ২ ধরনের ফল পাওয়া যায়। ১ দৈহিক বিকাশ ও ২ জীবনের প্রত্যক্ষ (বাস্তব) কাজের সাথে পরিচিতি লাভ।

 ইন্দ্রিয় পরিমাপন মূলক কাজের অনুশীলনঃতিনি তার পদ্ধতিতে শিক্ষণ, চিন্তন, বিচার করা ইত্যাদির চেয়ে ইন্দ্রিয়ের প্রশিক্ষণ এর উপর বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। এই জন্য তিনি বিভিন্ন ধরনের বস্তু বা উপকরণের কথা উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন আকারের কাঠের টুকরা, কাগজ, আসবাবপত্র, বিভিন্ন ধরণের মুদ্রা, পেন্সিল, বিভিন্ন রঙের উল, বাক্স, ঘন্টা, ঈঁনব, রং, বিভিন্ন তাপমাত্রার পানি ইত্যাদি।এই সব বস্তু বা উপকরণের সাহায্যে আকার, ওজন, স্পর্শ, শ্রবণ এবং রং প্রভৃতি প্রত্যক্ষণ সম্পর্কে সঠিক ধারনা গঠনে সহায়তা করা হয়। উল্লেখিত উপকরণের সাহায্যে শিক্ষাদানের পদ্ধতি শিক্ষাক্ষেত্রে ৩টি মনোবিজ্ঞানসম্মত মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলো হল সংযোগ, প্রত্যাভিজ্ঞা এবং পুনরুদ্রেক। এই পর্যায়ে মানসিক ক্রিয়া সংগঠিত হয়।

 লেখাপড়া শিক্ষায় অনুশীলনঃ মন্তেসরীর পদ্ধতিতে পড়ার আগে লিখা শেখানো হয়। এই পদ্ধতিতে তিনি শিক্ষা সঞ্চালনের তত্ত¡কে বিশেষভাবে কাজে লাগিয়েছেন। সাধারণ প্রস্তুতিমূলক সঞ্চালনকে ধীরে ধীরে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা হয় এই পদ্ধতিতে। হাতের লিখা শিখানোর জন্য তিনি ৩টি স্তরের কথা উল্লেখ করেন।

# প্রথমে বিভিন্ন আকৃতির বর্ণের পরিচিত হওয়া।এক্ষেত্রে বিভিন্ন আকৃতির বর্ণের সাথে পরিচিত করার জন্য সিরিশ কাগজে বর্ণ কেটে বোর্ডে আঠা দিয়ে আটকে দেয়া হয় এবং তাদের হাত দিয়ে তা স্পর্শ করে অনুভব করতে দেয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে পেন্সিল ব্যবহার করে সেই স্পর্শানুভূতিকে সঞ্চারিত করা হয়।
# শিক্ষার্থী যখন বর্ণগুলোকে এভাবে স্পর্শ করে অভ্যাস করতে থাকে শিক্ষক তখন সেগুলোর উচ্চারণ শোনান, শিশুদের ঐ শব্দ পুনরাবৃত্তি করতে বলা হয়। এতে তাদের পড়ার প্রস্তুতি হতে থাকে।
# পরবর্তী পর্যায়ে শিশুদের চবহপরষ এর উপর আয়ত্ব আনার চেষ্টা করা হয়। পড়া শিখানোর ব্যাপারে মন্তেসরী বলেন, শিক্ষার সময় যে প্রস্তুতি আসবে তা সঞ্চালনের মাধ্যমে শিশুরা পড়তে শিখবে, পড়া শিখানোর জন্য তিনি কার্ড ব্যবহার করেছেন। ঈধৎফ গুলোতে বিভিন্ন শব্দ লিখা থাকে। বাক্য শিখানোর ক্ষেত্রে ও এ ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
 গণিত শিক্ষায় অনুশীলনঃ তার মতে লেখাপড়ার পরে গণিত শিখবে, তবে এর জন্য নতুন কোন পদ্ধতির কথা বলেননি। প্রত্যক্ষ কোন বস্তুর সাহায্যে গণনা শিক্ষা ও অন্যান্য গণিতের কৌশল শেখানোর জন্য তিনি লং ষ্টেয়ার ব্যবহার করেছেন।
মন্তেসরী পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের চেয়ে শিক্ষণের উপর বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে; শিক্ষক নির্দেশক নয়, সহায়ক ভূমিকা পালন করবে শিশুদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে। তিনি মনে করেন শিশুরা হলো বাগান আর শিক্ষক বাগানের মালী। শিক্ষক মালী হিসেবে শিশুদের কাজ পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রয়োজন হলে সহানুভূতির সাথে তাদের সহায়তা করবেন এবং যত্নের সাথে পরিচর্যা করবেন। তবেই সকল শিশু সৌরভ ছড়াবে। শিক্ষকের সহানুভূতি, সহায়তা ও পরিচর্যার ফলেই শিশুর প্রতিভা বিকশিত হবে। পরবর্তীতে এই বিকশিত শিশুরাই সৌরভ ছড়াবে।

শুধু মারিয়া মান্তেসরী নয়, আরো অনেক দার্শনিক উপকরণ ভিত্তিক এ বিশেষ শিক্ষার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক বিভাগে এর যথার্থ প্রয়োগের ফলে আমরা অটিজম নামক প্রতিবন্ধীতার গ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারি। তবে এজন্য প্রাক-প্রাথমিকের সকল শিক্ষকের এ বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ আবশ্যক। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক বিভাগ মূলতঃ আটিজমের আশংকা থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়াস মাত্র। এ ছাড়াও সরকার প্রতি উপজেলায়, জেলায় এবং বিভাগীয় শহরে মোট ৫০০ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর স্কুল করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যার কিছু বাস্তবায়নও হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এসকল স্কুলে যে বিশেষ শিক্ষক প্রয়োজন তার অপ্রতুলতা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের কারণে স্কুলগুলো আশানুরূপ ফল দিতে পারছেনা। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর শিক্ষক হওয়ার জন্য একজন শিক্ষককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিন বিএসএড ও এমএসএড ডিগ্রী থাকা আবশ্যক। এছাড়াও তাকে জানতে হবে  esign language, speech therapy, occupational therapy ইত্যাদি। ধৈর্য্য, প্রশিক্ষণ, মনোবল, একাগ্রতা, সেবার মানসিকতা আর বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাতো বলাই বাহুল্য। এতসব গুণে গুণান্বিত বিশেষ শিক্ষক আমাদের দেশে খুব বেশী নেই। তাই প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা ভাল কিছু আশা করতে পারি। কেননা প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারলে ক্রমেই অটিজম আক্রান্তের হার হ্রাস পাবে। অভিভাবকগণ আরো সচেতন হবে। সমাজ দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করবে। এদেরকে সমাজের মুল ধারায় সম্পৃক্ত করে সম্পদে পরিণত করতে পারবো।

কিন্তু সমস্য হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক বিভাগে যে সাধারণ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে তারা কেউই গার্হস্থ বিজ্ঞান, পুষ্টি বিজ্ঞান, কিংবা মনোবিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রী নয়। তারা কেউ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর শিক্ষক নয়। যদি তাই হয় তাহলে উপকরণ ভিত্তিক এই বিশেষ শিক্ষা তারা কিভাবে দেবেন? চাকুরি গ্রহণের পর এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কোন প্রশিক্ষণ ও নেই। তাহলেএই সাধারণ শিক্ষকদের কাছ থেকে উপকরণ ভিত্তিক বিশেষ শিক্ষা আমরা আশা করতে পারিনা, এক্ষেত্রে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিপাত জরুরী বলে মনে করি।

মারিয়া মান্তেসরীর চিন্তা ও আমাদের রাষ্ট্রীয় চেতনা বোধের সমন্বয়ে প্রাক-প্রাথমিকে যে শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়েছে তা কীভাবে কার্যকর হবে? প্রাক-প্রাথমিকের মুল প্রতিপাদ্য হচ্ছে পড়াকে শিশুরা পড়া মনে করতে পারবে না, শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ উপকরণ ভিত্তিক। কী ধরণের উপকরণ ব্যবহার করতে হবে তা বোঝার কিংবা ব্যবহারের ধারণাও নেই ঐ সকল শিক্ষকদের। সরকার উপকরণ ক্রয়ের টাকা দিলেও তা কাজে লাগছেনা। তাই আমার মতে এ ধারনা বা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে হলে প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষকদের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর শিক্ষক দ্বারা প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরী।

 

শরীফ উদ্দীন আহমদ কিসলু এম এসএস (লোক প্রশাসন) ঢা বি

শরীফ উদ্দীন আহমদ কিসলু
এম এসএস (লোক প্রশাসন) ঢা বি

শরীফ উদ্দীন আহমদ কিসলু
এম এসএস (লোক প্রশাসন) ঢা বি
সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান,বানারীপাড়া উপজেলা পরিষদ, বরিশাল
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, অনুশীলন সাংস্কৃতিক নিকেতন সোসাইটি
০১৭১৫৯৫২১১৭, ০১৮৪২৯৫২১১৭, ০১৯১৯৯৫২১১৭

jarinkislu@gmail.com

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018