রয়ানীঃ সমাজ ধর্মের করুন গীত -বাপ্পী মজুমদার - বিডি বুলেটিন রয়ানীঃ সমাজ ধর্মের করুন গীত -বাপ্পী মজুমদার - বিডি বুলেটিন

শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৫০ অপরাহ্ন

রয়ানীঃ সমাজ ধর্মের করুন গীত -বাপ্পী মজুমদার

রয়ানীঃ সমাজ ধর্মের করুন গীত -বাপ্পী মজুমদার

বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল সম্ভার মনসা মঙ্গল কাব্য। এতে একই সূঁতোয় গাঁথা রয়েছে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মান-অভিমান, জেদাদেজী, বিচ্ছেদ-মিলন। স্বলক্ষে পৌছতে দেবতা-মানুষের দ্বন্দ্বের এক অপূর্ব সমাহার বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে মনসা মঙ্গল। এই কাব্য একটি নির্দিষ্ট ধর্মের ধর্মগ্রন্থ থেকে স্থান করে নিয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লোক কাহিনীতে। এই কাব্য প্রকাশ হওয়ার পর এর পাঠক সর্বস্তরে বিস্তৃত। মনসা মঙ্গল যখন দলীয়ভাবে সেজেগুজে বিভিন্ন চরিত্র রূপায়নের মাধ্যমে সুরেলা কন্ঠে জন সমক্ষে বিপুল দর্শক শ্রোতার উপস্থিতিতে যাত্রাপালার ন্যায় পরিবেশন করা হয় তখন তাকে রয়ানী বা ভাসান গান বলা হয়। মনসা মঙ্গল কাব্য বা রয়ানী গান বরিশাল অঞ্চলে রচিত হলেও লোকগানে এর জনপ্রিয়তা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমাদৃত। মধ্য যুগের কবি পণ্ডিত বিজয় গুপ্তের এই অনবদ্য সৃষ্টি গ্রাম-বাংলার সহজ সরল মানুষের মন বিশেষ করে নারীদের উদ্বেলিত করে আজও। সর্পদেবী মনসার স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে কবি বিজয় গুপ্ত মনসা মঙ্গল কাব্য রচনা করেছেন। এই প্রসঙ্গে কবি লিখেছেন-শ্রাবণ মাসে রবিবারে মনসা পঞ্চমী/তৃতীয় প্রহর রাত্রে নিদ্রা যায় স্বামী/নিদ্রায় ব্যাকুল লোক না জাগে একজন/হেনকালে বিজয়গুপ্ত দেখিল স্বপন/গৌরবর্ণ শরীর এক ব্রাক্ষ্মনের নারী/ রত্মময় অলঙ্কার দিব্য বস্ত্রধারী/চাঁচর মাথার কেশ জিনিয়া চামর/সর্বাঙ্গে বেড়িয়েছে সর্প অজগর/নাগরথ এড়িয়া দেবী বসিল হেম ঘটে/উঠ উঠ পুত্র বলি হাত দিলা পিঠে/ গা তোলো আরে পুত্র কত নিদ্রা যাও/শিয়রে মনসা তোমার চক্ষু মেলে চাও/মনে ভয় না করিও দেখে নাগ জাতি/মহাদেবের কন্যা আমি নাম পদ্মাবতী/ মোর পায়ে ভক্ত তুমি সেবক প্রধান/স্বপ্নে উপদেশ কহি না করিয় আন/আজ নিশি অবসানে এড়িয়া বসন/গীতচ্ছন্দে রচ কিছু আমার স্তবন ॥
এরপরই বিজয় গুপ্ত রচনা করেন মনসা মঙ্গল। যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পূজ্য ও ভক্তির বিষয়বস্তুতে পরিনত হয়েছে। পরিনত হয়েছে ধর্মীয় গ্রন্থে। এই কাব্য গ্রন্থটিকে সুর রসে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা সর্বত্র রয়ানী বা ভাসান গান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। রয়ানী বা ভাসান গান মূলতঃ চাঁদসওদাগর, লক্ষীন্দর ও বেহুলার প্রচলিত লোককাহিনী ভিত্তিক মনসাদেবীর মহাত্ম্যসূচক সংগীত। সর্পদেবী মনসার মহাত্ম্য প্রকাশেক ভক্তিসংগীত বলে এই গানকে মনসার গান নামেও অভিহিত করা হয়। রয়ানীর আভিধানিক অর্থ নেই। স্মৃতিকথা বা মহাত্ম্য গাঁথা, বিশেষ করে সর্পদেবী মনসার জন্ম থেকে লক্ষীন্দরের পুনর্জীবন প্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে তার দেবত্ব প্রচেষ্টার গীতি কাহিনীই রয়ানী নামে পরিচিত। এদের রচয়িতাদেরকে রয়ানীকার বলা হয়। এ দৃষ্টি কোন থেকে রয়ন (অর্থাৎ স্মৃতিকথা) শব্দ হতে রয়ানীর উদ্ভব ঘটেছে বলা যায়। অন্যদিকে সারারাত্রি এ গান পরিবেশিত হয়ে থাকে বলে রজনী শব্দ হতে রয়ানী গানের উৎপত্তি হতে পারে। তবে অধিকাংশের অভিমতঃ রয়ানী যাত্রা (যাত্রার অর্থ যখন একস্থান হতে অন্য স্থানে রওয়ানা হওয়া) শ্রেণীর গান। ফলে যাত্রার পূর্ববঙ্গীয় কথ্য ভাষা প্রকাশক রওয়ানা শব্দ হতে রয়ানী শব্দটির উৎপত্তি। এছাড়া রয়ানী গান চাঁদসওদাগরের ব্যবসা সংক্রান্ত ও বেহুলার স্বামী লক্ষীন্দরের পুনর্জীবন প্রাপ্তির অভিযাত্রামূলক সংগীত বলে (অভিযাত্রা-যাত্রা-রওয়ানা-রয়ানী) রয়ানী নাম করণ হয়েছে। সর্প পূজার প্রথা অত্যন্ত প্রাচীন। সর্পকে সর্প হিসাবে পূজা না করে সর্পদেবতা বা সর্পাত্মরূপেই পূজা করা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সর্প পূজার প্রচলন আছে। অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের সর্প টোটেম আছে; কিন্তু সর্প পূজার প্রথা নেই। আফ্রিকার প্রায় সর্বত্রই সর্প দেবতা রয়েছে। ভারতবর্ষের সর্প পূজা মূলতঃ সর্পদেরতারই পূজা। বাংলাদেশে মনসা সর্প দেবী হিসেবে পূজিতা হয়ে আসছে। দেবীর উদ্দেশ্যে মহাত্ম্যকীর্তন ও স্তুতিবাক্য হতে পরবর্তীকালে রূপান্তরিত হয়ে রয়ানী সংগীতের উৎপত্তি ঘটেছে এ কথা বলা যায়। লোক সমাজে প্রচলিত এই কাহিনীগুলোকে ভিত্তি করে মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পরিসর- মংগল কাব্যের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। বাংলার ঘরে ঘরে বিশেষ করে হিন্দুদের বাড়িতে এ সংগীত পরিবেশিত হত এক সময়ে। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে এ গানের স্রোতা। প্রতিবছর বিশেষতঃ বর্ষার (আষার ও শ্রাবন) আগমনে যখন সাপের অত্যাচার বৃদ্ধি পায় তখন গ্রামে গ্রামে এমনকি প্রায় পরিবারে মনসা পূজা কিংবা মনসার মহাত্ম্য পরিবেশিত হত। শ্রাবণ মাসের প্রথম থেকে শেষ দিন পর্যন্ত শ্রদ্ধা, ভয় ও শুভকামনায় মনসার গুন ও কাহিনী কীর্তিত হয়। রয়ানীকাররা তখন দিবারাত্র সংগীতাকারে রয়ানী পরিবেশন করে। লখাইকে সর্প দংশনের পর মা সনোকার বিলাপ সন্তানহারা মায়েদের মনে সৃষ্টি হয় আর্তনাদের। যেমন … এই না শ্রাবণ মাসে/ঘন বৃষ্টি পড়ে/ কেমন করে থাকবো লো আমি/ অন্ধকার ঘরে/ সোনার বরণ লখাইরে আমার/ বরণ হইলো কালো/ কিনা সাপে দংশিল তারে/ তাই আমারে বল…।

বর্ষণমূখর দিনের অবিশ্রান্ত ধারার সাথে এ গানের সুর একই সূত্রে গাঁথা। বৃষ্টির রিম-ঝিম শব্দের তালে তালে মানুষের অশ্র“পাতের মতই এ গান করুনরসের সঞ্চার করে। রয়ানীর বিষয়বন্তু, স্থান, ঘটনাপ্রবাহ ও বিশ্লেষন এবং চরিত্র চিত্রন একান্ত ভাবেই ভূ-প্রকৃতি, লোকমানস, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জনপদকেই উপস্থাপিত করা হয়েছে যেন। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের ফুল্লশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণকারী কবি বিজয়গুপ্ত রচিত মনসা মঙ্গলই বৃহত্তর বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গাওয়া হয়ে থাকে। সাধারণত শ্রাবণ মাসব্যাপী এ গান গাওয়া হয়। এ গানের শিল্পী ঘরের গৃহিনীরা। প্রত্যহিক গৃহকর্ম শেষে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে মনসা মন্দির চত্বর অথবা বাড়ির উঠোন বা ঘরের বারান্দায় হোগলা মাদুর পেতে বসে রয়ানীর আসর। শ্রোতা আশপাশের শিশু-কিশোর কিশোরী থেকে বয়োবৃদ্ধরা পর্যন্ত। বেহুলা লক্ষিন্দরের কাহিনীর মায়াজাল বা সুরের বৈচিত্রে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় উপভোগ করে রয়ানী। এই দৃশ্য বাংলার শতশত বছরের ঐতিহ্য। এখানে উল্লেখ করা যায় লক্ষিন্দরকে দর্শনের পূর্বে নির্দয় কালীনাগের বিলাপ ভক্ত শ্রোতার চোখের জল আহত চিত্তের প্রতিচ্ছবি-
মুই হেন অভাগিনী/ হেন ছার নহে জানি/ ছার কার্য্যে কেন আমি আসি/ ফিরিয়া ঘরেতে যাই/ পদ্মারে বড় ডরাই/ খাইলে পরানে দুঃখ বাসি/ রূপেতে অতি সন্দুর/ মহাবীর দক্ষিন্দর/ বত্রিশ লক্ষণ ধরে গায়/ দেখিয়া দুঃখী নাগিনী/ কাতর হইলো পরানী/ দুঃখে করে হায় হায়/ হারাইয়া সর্ব্বজন/ পাইয়াছে এই ধন/ কি বলিয়া প্রবোধিবে মায়/ তার প্রাণের দোসর/ একমাত্র লক্ষিন্দর/ কালসর্পে তারে খেয়ে যায়/ মুই যদি জানি সাঁচে/ নির্ব্বন্ধেতে এই আছে/ তবে আমি রহিতাম ভাঁড়ি/ আসিলাম রাত্রিভাগে/ দেখিয়া যে দুঃখ লাগে/ হেন কন্যা হইবেক রাঁড়ী/ সর্বাঙ্গ অতি সুন্দরী/ যেন স্বর্গ বিদ্যাধরী/ অলক্ষণ নাহি কোন গায়/ রূপেতে যে মনোহর/ কণ্যা যোগ্য হয় বর/ বিধাতা বিমুখ হইল তায়/ পামরী তুমি মনসা/ তোর মনে কিবা আশা/ বুঝিতে নারিনু আমি সাঁচে। যেমন এই মহাজন/ খাইতে করেছ মন/ আপন পেটের পুত্র আছে/ আমি যে নাগিনী লোক/ নাহি জানি মনে শোক/ খাইতে যে দুঃখ বাসি বড়/ এমন মহাবীর/ সুন্দর সর্ব্ব শরীর/ কোনখানে লইব কামড়/ চিন্তিয়া চিত্ত উতালি/ হেন মায়ার পুতলী/ বিষেতে বিবর্ণ হবে কায়/ বিষ যে কাল বিকাল/পুরিলেক দুই গাল/লখাইরে দংশিতে কালী যায়/মুখেতে নাহিক রাও/স্থুল করিলেক গাও/নিকটে ছাড়িল নিজ ফনা॥

মনসা মঙ্গল কাব্য পাঠক হৃদয় যতটা না জয় করতে পেরেছে তার চেয়ে অধিকগুন শ্রোতার অন্তর কানায় কনায় পূর্ণ করতে পেরেছে রয়ানী গান। রয়ানী লোক কাহিনীতে এমন শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে যা লোকজ সংস্কৃতি উৎসব আয়োজনে রয়ানী বা ভাসান গান থাকে অগ্রভাগে আকর্ষণীয় পর্বে। কালের বিবর্তনে রয়ানী গান ধর্মের গন্ডি পেরিয়ে শিল্প আসনে অধিষ্ঠিত। গৃহিনীদের বাইরে একদল শিল্পী সৃষ্টি হয়েছে যারা রয়ানীকে আধুনিক ফর্মে নিয়ে এসেছেন পরিবেশনার দিক থেকে। তাদের পরিবেশনায় ঢং ও সুরের বৈচিত্র প্রবল। উপস্থাপনেও রয়েছে নাটকীয়তা। শিল্পীদের সাজসজ্জায় পরিলক্ষিত হয় ধর্মীয় প্রভাব। ব্যবহৃত হয়ে থাকে নানা ধরণের বাদ্যযন্ত্র। এ সকল দলের শিল্পীরা রয়ানী গান পরিবেশন করেন বড় বড় লোকজ উৎসবে এবং মানত অনুষ্ঠানে। রয়ানী পরিবেশনেরও প্রকারভেদ রয়েছে। উৎসবে পরিবেশন করা হয় কাব্যের বিশেষ বিশেষ অংশ আর সার্বজনীন অথবা মানত অনুষ্ঠানে পরিবেশন হয় পুরো কাব্য। কারণ মানত অনুষ্ঠান হয় টানা তিন দিন বা সাত দিনের। এখানে রয়ানীর সমাপনী দিনে শিল্পী প্রধান বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে আশির্বাদ করেন মানত পরিবারের সদস্যদের। বরিশাল অঞ্চলে রয়ানী শিল্পী দলের মধ্যে রয়েছে আগৈলঝাড়ার কোদালধোয়ার নিমাই দেউরী সম্প্রদায়, গৌরনদী বাটাজোরের শৈলেন সম্প্রদায়, ঝালকাঠী কীর্তিপাশার সুধির কীর্তনিয়া সম্প্রদায়, পিরোজপুর নাজিরপুরের মালতি সম্প্রদায় ও বানারীপাড়া বাইশারীর বানীকান্ত সম্প্রদায়। কবি বিজয় গুপ্ত পদ্মা-পুরান রচনার পরে গৈলায় প্রতিষ্ঠা করেন মনসা মন্দির। সেই মন্দিরে স্থাপন করা হয় পিতলের মনসা প্রতিমা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে প্রতি বছর শ্রাবন মাসে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় রয়ানী গান। অগনিত দর্শক শ্রোতার সমাগম মুখরিত করে তোলে গৈলাকে। এছাড়াও বরিশাল নগরীর একমাত্র মনসা মন্দির কাউনিয়া সার্বজনিন মনসা মন্দিরে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় তিনদিন ব্যাপী রয়ানী উৎসব। যা পরিনত হয়েছে শত শত বছরের ঐতিহ্যে। তবে বরিশাল অঞ্চল রয়ানী গানের আবহ বহমান মধ্য যুগ থেকে।

মনসা মঙ্গল রচিত হয়েছে সর্প দেবী মনসার দেবীত্ব অর্জনের কাহিনী নির্ভর এবং মনসা দেবীর মহাত্ম্য প্রচারে। ভোলা মহেশ্বর দেবাদিদেব শিবের কন্যা হয়েও মনসার দেবতালোকে প্রবেশাধিকার ছিলনা শুধু মাত্র দেবীত্বের স্বীকৃতি না থাকায়। আর দেবীত্ব অর্জন করতে হলে প্রয়োজন মনুষ্য লোকের বনিক রাজা চাঁদসওদাগরের পূজা। শিবের ভক্ত হওয়ায় চাঁদ অন্যকারো পূজা করতে নারাজ। মনসার তরফ থেকে অনেক বোঝানো সত্ত্বেও মনসাকে পূজা না করার সিদ্ধান্তে অনঢ় থাকে চাঁদ। শুরু হয় মনসা-চাঁদসওদাগরের দ্বন্ধ। দ্বন্দ্বে ক্ষুব্দ মনসা সর্বস্ব কেড়ে নেয় চাঁদের। ঝড় তুলে একের পর এক বণিক রাজের বাণিজ্যিক তরী সপ্তডিঙ্গা তলিয়ে দেয় সাগরে। কনিষ্ঠ পুত্র লক্ষিন্দরসহ সাত ছেলে সর্প দংশনে মেরে ফেলে মনসা। বসত ভিটা কেড়ে নিয়ে পথের ফকির বানায় বনিক রাজ চাঁদকে। তবুও মাথা নত করাতে পারে সওদাগরকে। এছাড়াও মনসা বহু কৌশল অবলম্বন করেছিল চাঁদের কাছ থেকে পূজা পেতে। কিন্তু সব ছলনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। একদিকে মনসার দেবীত্ব অর্জনে চাঁদের কাছ থেকে পূজা পাওয়ার চেষ্টা, অপরদিকে ভোলা মহেশ্বরের ভক্ত হয়ে মনসার কাছে মাথা নত না করা, এই যে দেবতা-মানুষের জেদাজেদি অস্থিত্ব রক্ষার লড়াই মনুষ্যজগতে ন্যায় প্রতিষ্ঠারই ইঙ্গিত। পদ্মা-পুরান বা মনসা মঙ্গলে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ কাহিনী হচ্ছে বেহুলা লক্ষিন্দর অধ্যায়। মনসা যখন চাঁদকে কোন ভাবেই ঘায়েল করতে পারছিল না তখন সর্প দংশনে ছেলেদের কেড়ে নিতে থাকে। ছয় ছেলে মেরেও যখন তাকে বশে আনতে পারেনি তখন সপ্তম ও কনিষ্ঠ ছেলে লক্ষিন্দরকে লোহার বাসর ঘরে কালীনাগ দংশনে মৃত্যু ঘটায় মনসা। পতিব্রতা সতীলক্ষী বেহুলা স্বামী লক্ষিন্দরের জীবন ফিরিয়ে আনতে শিবলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে লক্ষিন্দরের মৃতদেহ নিয়ে কলাগাছের ভেলায়। পথে-পথে, ঘাটে-ঘটে বিপদ, শত প্রতিকুল অবস্থা উপেক্ষা করেও শিবলোকে পৌছতে সক্ষম হয় সতীসাধ্বী বেহুলা। নেচে-গেয়ে মহেশ্বরকে সন্তুষ্টি করা হয়। ভোলা মহেশ্বরের আদেশে কন্যা মনসা লক্ষিন্দরসহ সাত ভাইয়ের জীবন ফিরিয়ে দেয় চাঁদ কর্তৃক মনসাকে পূজা করার শর্তে শেষে শিবের আদেশে পুত্রবধু বেহুলার অনুরোধে সন্তানদের পেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চাঁদ পূজা করতে বাধ্য হয় মনসাকে। মনসা অর্জন করে দেবীত্ব। হারানো সর্বস্ব ফিরে পায় চাঁদ। অবসান ঘটে মনসা-চাঁদের দ্বন্দ্ব। স্বামী লক্ষিন্দরের পুনর্জীবনে উদ্দেশ্যে সতী বেহুলার জীবন সংগ্রাম যুগ যুগ ধরে অবহেলিত নির্যাতিত বাঙালি নারী সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সংগ্রামকে উৎসাহিত করে। ছয়মাস নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যে স্বামীর জীবন ফিরিয়ে আনলো সেই স্বামী লক্ষিন্দর নতুন জীবন পেয়ে সতী বেহুলার সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এক পর্যায় নিজের সতীত্ব প্রমানের জন্য সীতার ন্যায় বেহুলাকেও দিতে হয় পরীক্ষা। বেহুলার পরীক্ষা বিষয়ে পদ্মা-পুরানে উল্লেখ আছে-
লখাই বলে স্ত্রী জাতি কিবা কর্ম বুঝে/ অরন্য মধ্যে বসিয়া নানা সুখ ভুঞ্জে/ সতী পরিব্রতা হউক ধর্ম্মেতে তৎপর/ স্বতন্তর হইলে নারী ফলে অথান্তর/ জলে স্থলে দূর দেশে করিল প্রবাস/ একেশ্বর হইয়া বেহুলা ভ্রমে ছয় মাস/ সঙ্গতি দোসর নাই পথে নানা ভয়/ এতেক পাষন্ড কোথা স্ত্রীধর্ম্ম রয়/ মনসুখে একেশ্বর ভ্রমে ছয় মাস/ হেন নারী ঘরে নিলে লোক করিবে উপহাস/ রাবনের ঘরে সীতা হইল প্রমাদ/অগ্নি পরীক্ষা দে তবু লোকে বাদ/অগ্নি শুদ্ধ হইল সীতা দেবলোক সাক্ষী/ তবুও তো লোকে বলে সীতা রাবনের সখী/নগরের লোকের স্ত্রী বিশেষ বণিক/ সাত পাঁচ ভাবিয়া লখাই স্থির করে চিত/ কোপমনে বসিল লখাই না চাহে বেহুলার ভীত/ বেহুলা যত কথা কহে কিছু নাহি শুনে/ লখাইর আশা বুঝিয়া করে কানাকানি/ লখাই বেহুলারে বর্জ্জিবে হেন অনুমানি/ যে নারী হইতে হইল সকল উদ্ধার/ হেন নারী বর্জ্জিবে লখাই কোন ব্যবহার/ শেষে নিজের শুদ্ধতা প্রমানের জন্য বেহুলা নল খাঁক দিয়ে খাড়ৈ বুনে, সেই খাড়ৈতে নদীর জল এনে শুদ্ধতার পরীক্ষ দিল বেহুলা। এই কাহিনী থেকে গ্রাম বাংলার সহজ সরল-অবলা নারীদের বেহুলার করুন পরিস্থিতির জন্য মন কেঁদে ওঠে, আবার আন্দোলিত করে পুরুষ শাসিত সমাজের বিরুদ্ধে। পদ্মা-পুরানের এই কাহিনীগুলোই রয়ানী গানের মাধ্যমে সাধারণের মাঝে বিস্তার লাভ করেছে। মধ্যযুগ থেকে রয়ানী টিকে আছে তার বৈচিত্রপূর্ণ ব্যঞ্জনায়, আগামীতেও টিকে থাকবে শেকরসন্ধানী মানুষের প্রেরণা-উৎসাহ আর লোক মানসে প্রোথিত কাহিনীর পরম্পরা ট্রাজেডি ও মানুষের সফলতার জয়গানে। মনসা মঙ্গলের বানী ও সুর যে-দেবতার প্রতি মানুষের চ্যালেঞ্জ এবং মানুষেরই জয়গাথা, তাই মানুষই টিকিয়ে রাখবে রয়ানীর সুর-বানীর ঝরণা ধারাকে।
তথ্য সূত্রঃ কবি বিজয় গুপ্ত প্রনীত মনসা মঙ্গল, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী সুশান্ত ঘোষ, রয়ানী ঃ বরিশালের ঠিকুজী, অধ্যাপক দেবাশীষ চক্রবর্তী।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018