শেবাচিমে রোগীর খাবারে ব্যাপক দুর্নীতি, বাজারের চেয়ে তিনগুন বেশি বিল ভাউচার - বিডি বুলেটিন শেবাচিমে রোগীর খাবারে ব্যাপক দুর্নীতি, বাজারের চেয়ে তিনগুন বেশি বিল ভাউচার - বিডি বুলেটিন

বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ১১:২৩ পূর্বাহ্ন

শেবাচিমে রোগীর খাবারে ব্যাপক দুর্নীতি, বাজারের চেয়ে তিনগুন বেশি বিল ভাউচার

শেবাচিমে রোগীর খাবারে ব্যাপক দুর্নীতি, বাজারের চেয়ে তিনগুন বেশি বিল ভাউচার

Print Friendly, PDF & Email

মনির হোসেন:
রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের ‘বালিশকান্ড’, ফরিদপুর মেডিক্যালে ‘পর্দা’ ও পটুয়াখালীর বাউফলে ‘স্কুলের বেঞ্চ কেলেংকারী’ দেশব্যাপী দুর্নীতির চালচিত্রকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। এবার সামনে এসেছে দক্ষিণাঞ্চলবাসীর চিকিৎসা সেবার একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের খাবার প্রদানের নামে পরিচালকের পুকুর চুরির দুর্নীতির তথ্য।

একসাথে হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করার মত ঘটনা না ঘটলেও বছরের পর বছর ধরে পর্যায়ক্রমে বিল ভাউচারের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে কোটি টাকা। শুধু তাই নয় নিজের অদক্ষতার কারনে অতিসম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে গোটা দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র আইসিইউটি। সর্ববৃহৎ আইসিইউটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারনে ইতোমধ্যে এক তরুন চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনার পর আলোচনায় এসেছে শেবাচিম হাসপাতালের সেবার চিত্র। প্রতিদিন আইসিইউতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের চরম ভোগান্তিতে পরতে হচ্ছে। জীবন রক্ষায় রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে ছুটতে হচ্ছে ঢাকায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেবাচিমের একাধিক চিকিৎসকরা দাবী করেছেন, বিল-ভাউচার ছাড়া আর কোন দক্ষতা এখন পর্যন্ত দেখাতে পারেননি হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ বাকির হোসেন। তার এই অদক্ষতার কারনে শেবাচিমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের কোন উপযোগিতা নেই। ডাক্তার ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানে এমন কোন ইকুয়েপমেন্ট নেই যা জরুরী মুহুর্তে রোগীর উপকারে আসবে। অপরদিকে পুরো হাসপাতালে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের চিত্র অনেক আগেরই। ফলে শেবাচিম হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যখাতের ভিশন বাস্তবায়ন হচ্ছেনা বলেও চিকিৎসকরা উল্লেখ করেন।

তারা সরাসরি জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নিজের অক্ষমতাকে ঢেকে রাখতে পারলেও তরুন চিকিৎসক নয়নের মৃত্যুর দায় হাসপাতাল পরিচালক এড়াতে পারেন না। এনিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রোগীর জন্য খাদ্য প্রদানে ২০১৯-২০২০ইং সালের খাবারের দরপত্র তালিকায় গৃহিত বিল বাংলাদেশের যেকোন সময়ের বাজার দরকে হার মানিয়েছে। আর এই বিল ভাউচার প্রদান করেছেন হাসপাতাল পরিচালক ডাঃ বাকির হোসেন। চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর পরিচালকের অনুমোদন দেওয়া ওই ভাউচারে দেখা গেছে, রোগীদের জন্য প্রতিকেজি পাঙ্গাস মাছ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্রয় করছে ৩৮০ টাকায়, মা ইলিশ প্রতি কেজি ১৫০০টাকায়, গ্রাস কার্প বা মিনার কার্প মাছ প্রতিকেজি ৩৯৫ টাকায়, রুই-কাতলা মাছ প্রতি কেজি ৪৬০ টাকা, ফার্মের ডিমের প্রতি পিস নয় টাকা ৯০ পয়সা, ব্রয়লার মোরগের মাংস প্রতিকেজি ৩৫০ টাকা, খাসীর মাংস ৭৯০ টাকা করে প্রতিকেজি ক্রয় করা হচ্ছে।

বাজারঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে পাঙ্গাস মাছ প্রতিকেজি খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১১০টাকায়, ইলিশ মাছ ১১০০টাকা, গ্রাস কার্প বা মিনার কার্প প্রতিকেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, রুই-কাতলা প্রতিকেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, ফার্মের মুরগীর ডিম ৩২ টাকা, ব্রয়লার মোরগের মাংস ১২০ টাকা ও খাসীর মাংশ ৭৫০ টাকা।

বরিশাল নগরীর বাংলাবাজার, রূপাতলী ও সাগরদী এলাকার বাজারের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে বর্তমান বাজারদরের মূল্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাংলা বাজারের ব্যবসায়ী সোহেল আহমেদ বলেন, পাঙ্গাস মাছের কেজি ৩৮০ টাকা আমার জানামতে বাংলাদেশের কোথাও হয়নি। আর এই মাছ দেশের সব অঞ্চলেই উৎপাদন সম্ভব। ফলে এমন আকাল পরেনি যে এর কেজি ৩৮০ টাকা হবে। ফার্মের মুরগী বিক্রেতা কবির মিয়া বলেন, আমার জীবনে সর্বোচ্চ দামে ব্রয়লার মুরগীর মাংস বিক্রি করেছি কেজিপ্রতি ১৬০ টাকা। এর বেশি কখনোই হয়নি; হবেও না। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতিকেজি ১১০ টাকা দরে ব্রয়লার মুরগী বিক্রি হচ্ছে। সেখানে হাসপাতালে ব্রয়লার মোরগের মাংস প্রতিকেজি ৩৫০ টাকা করে ক্রয়ের ভাউচার করা হচ্ছে।

সরেজমিনে শেবাচিম হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, রোগীদের খাবারের নামে (তিন বেলায়) কলা-রুটি, সিদ্ধ ডিম, ব্রয়লার মুরগীর মাংস ও আলুর তরকারী, পাতলা ডাল এবং ভাত ছাড়া আর কিছু খাওয়ানো হয়না। সেই খাবারও রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়ার নাম করে ১০ থেকে ২০ টাকা করে দিয়ে কিনে রাখতে হয়। রোগীরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালের স্টাফরা প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ হাজার টাকার ভাত বিক্রি করে থাকেন।

হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটে শুক্রবার সকালে (রোগী প্রতি) একটি সিদ্ধ ডিম, এক প্যাকেট পাউরুটি ও দুটি কলা রোগীর খাদ্য হিসেবে দেয়া হয়েছে। দুপুরে পাতলা ডাল, ব্রয়লার মুরগীর মাংস ও ভাত দেয়া হয়েছে। রাতেও একইভাবে ভাত, ডাল ও ব্রয়লার মাংস দেয়া হয়। একাধিক রোগীরা অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালে খাবারের মান যেমন খারাপ, তেমনি এখানের আয়া-বুয়াদের ব্যবহারও খারাপ, এর জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জোর দাবী করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শুক্রবার রাতে শেবাচিমের মেডিসিন, সার্জারি, অর্থপেডিক্স বিভাগের একাধিক স্টাফরা জানিয়েছেন, বিগত ছয় মাসে শেবাচিমে কোন মাছ রোগীদের জন্য দেওয়া হয়নি। শুধু ব্রয়লার মুরগীর মাংস, ডাল ও ভাত দিয়েই শেষ করা হচ্ছে রোগীর খাদ্য। তারা আরও বলেন, পাঙ্গাস, রুই-কাতলা, কার্প জাতীয় মাছ, ইলিশ বছরে দুই-একদিন খাওয়ানো হয়। আর খাসীর মাংস বিগত চার-পাঁচ বছরেও খাওয়ানো হয়নি।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, উচ্চমূল্যে দরপত্রের বিল-ভাউচার করা হলেও শেবাচিমের কাঁচাবাজার ক্রয় করা হয় নগরীর সিটি মার্কেট এলাকা থেকে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তিন-চারদিনের কাঁচা বাজার একদিনে করা হয়। তাও বস্তামূলে অর্ডার দিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। কেউ এর মানও দেখে না। আর মাছ-মাংস-ডিম কোথা থেকে খরিদ করা হয় তাও কেউ কোনদিন দেখেননি। অভিযোগের ব্যাপারে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ বাকির হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্ঠা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 233 total views,  2 views today

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018