শনিবার, ২০ Jul ২০১৯, ০৫:১১ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ সংবাদ :
ঘুম থেকে কি জাগবেনা আমাদের বিবেক??

ঘুম থেকে কি জাগবেনা আমাদের বিবেক??

বাহাউদ্দিন তালুকদার:

আমাদের দেশের নারী অধিকারের পরিপন্থী যেসব রীতিনীতি রয়েছে তার অন্যতম হলো- ধর্ষণ মামলায় আইনি প্রতিকারের জন্য পুরুষ ডাক্তার কর্তৃক ধর্ষিতার শরীর পরীক্ষা। বারবার এ সমস্যা সমাধানের তাগিদ আসে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু প্রতিকার হচ্ছে না। একজন নারী যখন ধর্ষিত হয় কিংবা খুন হয় তখন তার সুরতহাল রিপোর্ট সম্পন্ন করছেন একজন পুরুষ ডাক্তার। কখনো সঙ্গে থাকেন পুরুষ পুলিশ অফিসারও। এটা কতটা লজ্জার? এর আগে উচ্চ আদালত নারী পুলিশ এবং নারী ডাক্তার দিয়ে সুরতহাল রিপোর্ট করতে রায় দিয়েছেন। সে রায় কতটা কার্যকর হয়েছে? এখনো হরহামেশাই নারীর মৃতদেহ কিংবা ধর্ষিতার দেহ পরীক্ষা করছে পুরুষ। এটা একজন নারীর জন্য কতটা অপমানের? রাষ্ট্রের কি অধিকার আছে একজন নারীর শ্লীলতাহানি করার? এটা তো অবশ্যই শ্লীলতাহানি। আমরা জানি একজন ধর্ষিতাকে কী পন্থায় ডাক্তারি পরীক্ষা (সুরতহাল) করা হয়। নির্যাতনের শিকার একজন নারীর জন্য এটি দ্বিতীয়বার যৌন নির্যাতনের শামিল। নির্যাতনের শিকার নারী এর ফলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এ ধরনের পরীক্ষা নারী ডাক্তার ও নার্স দিয়ে করা উচিত। এ রাষ্ট্র কি সে ব্যবস্থা রেখেছে? মূলত বাধ্য হয়েই একজন ধর্ষিত নারী পুরুষ ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করাচ্ছে। একজন ধর্ষিতাকে বাধ্য হয়ে একজন পুরুষ পুলিশ অফিসারের কাছে তার লজ্জার কথা অকপটে বলতে হচ্ছে। বিপদে না পড়লে বোধ করি কখনোই একজন নারী পুরুষ ডাক্তারের সামনে পোশাক খুলে বিবস্ত্র হতেন না। ধর্ষণের সেই নির্মম কাহিনীর ধারা বর্ণনা দিতেন না। যখন চিকিৎসক একজন নারীকে শরীরের সব পোশাক খুলে ফেলতে বলেন তখন জীবনটা তার কাছে যন্ত্রণাদায়ক মনে হয় বৈকি। এটা তার জীবনে দ্বিতীয় ধর্ষণও। পরিতাপের বিষয় এই যে শুধু ধর্ষকের শাস্তির জন্য এত কিছু করার পরও সেই মামলায় ধর্ষক বেঁচে যাচ্ছে প্রায় ক্ষেত্রেই। সত্যি বিচিত্র এ দেশ! এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা। স্মরণ রাখতে হবে, আমরা সবাই কোনো না কোনো পরিবারের সদস্য এবং পরিবারে আমাদের সবারই মা, বোন ও মেয়ে রয়েছে। তারা যে কেউ এ পরিস্থিতির মুখোমুখি যদি হয় তখন আমাদের একই কষ্ট লাগবে। কথা হলো কোনো মহিলা পুলিশ অফিসার অভিযোগ নিলে ধর্ষিতারা অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারবেন। তার ডাক্তারি পরীক্ষা যদি কোনো মহিলা ডাক্তার করেন তবে তার সহমর্মিতা পেতে পারেন অত্যাচারিতা। এতে তদন্তের কাজও দ্রুত শেষ হতে পারে। পারিবারিক নির্যাতন, সহিংসতা, ধর্ষণ, ইভ টিজিং, যৌন হয়রানিসহ নারী ভিকটিমদের সাপোর্ট দিতে নারী পুলিশ কর্মকর্তা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে নারী ভিকটিমরা সব বিষয় শেয়ার করতে পারে না। এ ছাড়া কোনো নারী খুন হলে তার সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করতে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাকে সমস্যায় পড়তে হয়। ধর্ষণ, হত্যা, দুর্ঘটনার মামলা অথবা ছেলে বা মেয়ের বয়স নির্ধারণে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে সনদ নিতে হয়। আইনের চোখে এ সনদ গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অনেকে মনে করেন, এ দলিল পেতে দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শিকার হন নারী। অবাক করার বিষয় যে দেশের কোনো হাসপাতালেই নারীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য পৃথক কক্ষ নেই। চিকিৎসকদের বসার কক্ষের পুরুষ চিকিৎসক পুরুষ ওয়ার্ডবয়ের সহযোগিতায় সেই টেবিলের ওপর ধর্ষণের শিকার নারীকে রেখে তার পরিধেয় কাপড় খুলে শারীরিক পরীক্ষা করেন। আর এভাবে পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে অাঁতকে ওঠেন সবাই। পরীক্ষার আতঙ্কে অনেকে অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া থেকে বিরত থাকেন। প্রশ্ন হলো কেন এই পদক্ষেপ? কোনো কোনো পুলিশ কর্তাকে বলতে শুনি, এসব মামলা তদন্ত সম্পন্ন করতে গিয়ে তারাও বিব্রত হচ্ছেন। এটা পুরোপুরি অমানবিক। বহু ক্ষেত্রে ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে থানার তদন্তকারী কর্মকর্তার অশ্লীল প্রশ্নবাণে কার্যত দ্বিতীয়বার ‘ধর্ষিত’ হন ধর্ষিতা। সেই পীড়নকে আমরা কেন যৌন নিপীড়ন বলব না? এ থেকে নির্যাতিতাদের বাঁচাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ লজ্জাটা শুধু ধর্ষিতা অসহায় অবলা নারীর লজ্জা তা বলব না। এটা আমাদের লজ্জা; এটা রাষ্ট্রের লজ্জা! বিষয়টি গোটা দেশবাসীর জন্যই লজ্জার। নারীর প্রতি সমঅধিকার, নারী বৈষম্য, নারী নির্যাতন, সব কর্মে নারীর সমান সুযোগ, নারী শিক্ষার উন্নতি জাতীয় ব্যাপক নীতিকথার বুলি কচলান আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা। তাদের সেই নীতি যে কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে তার প্রমাণ তো এই লেখাতেই মিলছে। এ দেশের ধর্ষিতারা বছরের পর বছর ধরে বিচার চাইতে গিয়ে ফের শ্লীলতাহানির শিকার হলেও দেশের বিবেকবান মানুষ কেন প্রতিবাদী হচ্ছে না? মানুষের অন্তর চক্ষুতে কেন উপরোক্ত ঘটনা ধরা পড়ে না? তাদের বিবেক কেন জাগ্রত হয় না? নাকি ভেবে নেওয়া যায় কোনো বিবেকবান মানুষ এ পর্যন্ত এ দেশে জন্মই হয়নি? হলে তারা; আমরা কেন আজ চুপটি মেরে; ঘাপটি মেরে আছি। এ জন্য দায়ী কে? মনে করা স্বাভাবিক এ দায় আমাদের বিবেকের দায়। প্রশ্ন হলো, আমাদের বিবেক কেন জাগ্রত নয়?

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018