শনিবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৯, ০৭:০১ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধু হত্যা প্রতিরোধ হলো না যেসব সেনা কর্মকর্তার কারনে

বঙ্গবন্ধু হত্যা প্রতিরোধ হলো না যেসব সেনা কর্মকর্তার কারনে

সোহেল সানি: বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সুবিচার হয়নি। বিচারে যেমন খুনীদের মৃত্যুদন্ড হয়েছে, তেমনি সুবিচারের অভাবে পার পেয়ে গেছেন সামরিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যাদের কেউ কেউ কর্তব্যে অবহেলা আবার কেউবা রহস্যজনক ভুমিকা পালন করে হত্যার বৈধতা দিয়েছেন।
যেমনঃ নিজেই এক বিবৃতিতে স্বীকার করেন, বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আক্রমনের খবর সর্বপ্রথম জানতে পারেন ডিজিএফআই ব্রিগেডিয়ার আব্দুর রউফ।
একজন গোয়েন্দা ডাইরেক্টর তাকে রাত আড়াইটা-তিনটার দিকে ক্যান্টনমেন্টে ট্যাংক ও সৈন্য চলাচলের খবরটি দেন। তখনও ট্যাংক বহর ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বড় রাস্তায় বের হতে কেবল প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এই জরুরি গোপন বার্তা পেয়ে রাষ্ট্রপতিকে রেড টেলিফোনে সর্তক করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি চুপচাপ থাকলেন। রাত তিনটা থেকে ভোর সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত ডিজিএফআই ব্রিগেডিয়ার রউফ কি করেছিলেন? জানা যায়, রউফ বরং মহা বিপদ সঙ্কেত আশঙ্কা করে নিজ পরিবারকে নিয়ে বাসার পেছনে গলফ্ কোর্সে একটি গাছের ঝোপে লুকিয়ে থেকেছিলেন। তিনি সকাল সাড়ে ছ’টায় লুঙ্গি পড়ে সেনাপ্রধানের বাসভবনে প্রবেশ করেন। সেনাপ্রধানের একজন ব্যাটম্যান হাবিলদার তাকে প্রবেশে সাহায্য করেছিলেন। বাসায় প্রবেশ করে ব্রিগেডিয়ার রউফ দেখতে পান সেনাপ্রধান শফিউল্লাহর সঙ্গে সেনা উপপ্রধান জিয়াউর রহমান কথা বলছেন।

রউফ নাখোশ যে কারণে: রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ডিজিএফআই পদ থেকে সরিয়ে দিলেও আব্দুর রউফ তখনও দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি। কিছুটা গড়িমসিও করছিলেন নবনিযুক্ত ডিজিএফআই ছিলেন কর্নেল জামিলের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে। রউফের ভুমিকা ও অস্বাভাবিক আচরণের হেতু রহস্যাবৃত থেকে গেছে, হত্যাকান্ডের বিচার হলেও।
ডিজিএফআই পদে দায়িত্বগ্রহণ হলোনা কর্নেল জামিলের: কর্নেল জামিলের ডিজিএফআই পদে দায়িত্বগ্রহণের দিন ধার্য ছিল ১৫ আগস্ট। কিন্তু সেই দায়িত্বগ্রহণের কয়েক ঘন্টা আগেই তাকে মৃত্যুদূত যেন তাড়া করে ফিরলো। রাষ্ট্রপতির ফোন পেয়ে আক্রান্ত বাসভবনের দিকেই ছুটে চললেন তিনি। জিপে করে বাঁধা উপেক্ষা করে বাসভবনের দিকে এগুতে চাইলে কর্নেল জামিলকে ওখানেই গুলি করে হত্যা করা হয়।
ডি এম আই লেঃ কর্নেল সালাউদ্দীন সাড়ে চারটার দিকে রাস্তায় সৈন্য ও ট্যাংক চলাচলের খবর পেয়ে সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে ক্রমাগত ফোনে পাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ৫-৫০ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতিকে ফোনে পেয়ে যান। আক্রান্ত হওয়ার খবর দেন রাষ্ট্রপতিকে। ৫-৫৫ মিনিট তখন। এরপর পরই রাষ্ট্রপতি হত্যার শিকার হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ড রুপে আনুমানিক সময় হিসাবে ইতিহাসে যা নির্ধারিত হয়েছে ভোর ছ’টা, শুক্রবার ১৯৭৫।
কর্নেল সালাউদ্দীন ভোর ৫-১৫ থেকে ৫-৩০ মিনিটের মধ্যে সেনাপ্রধান কেম এম শফিউল্লাহকে সম্ভাব্য অভিযানের খবরটি দিয়েছিলেন। খবর পেয়ে সেনাপ্রধান রাষ্ট্রপতিকে পাওয়ার জন্য ক্রমাগত ফোন ঘোরাতে থাকেন। ৫-৫০ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতিকে ফোনে পেয়ে যান। রাষ্ট্রপতি সেনাপ্রধানকে বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার খবর জানান এবং ফোর্স পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সেনাপ্রধানের ভুমিকা: রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের ফোন পেয়েই প্রথমে সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়েত জামিলকে ফোন করে আক্রমনের খবরটি দেন। একই সময় হত্যাকান্ডের অন্যতম হোতা মেজর রশীদ পৌঁছে যায় শাফায়েত জামিলের বাসায় এই খবর দিতে যে তারা শেখকে হত্যা করেছে। পাল্টা আক্রমন করার সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি শাফায়েত জামিল। অথচ, ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার হিসাবে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন পদাতিক বাহিনী প্রধান। চার হাজার সৈন্যসংখ্যা যার।
সকাল ৯-৪৫ মিনিট। সেনা, নৌ, বিমান -তিন বাহিনী প্রধানের মধ্যে ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারে উপস্থিত হলেও কর্নেল শাফায়েত ছিলেন অনুপস্থিত।
ফারুক-রশীদের আক্রমণ প্ল্যানে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত ৪৬ ব্রিগেডকে উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করা এবং কোনরকম পাল্টা আক্রমণের আশঙ্কা না করাটা ছিল রহস্যময় ঘটনা। ৪৬ ব্রিগেডের কথা না ভেবে ফারুক তার সমস্ত ট্যাংক বাহিনী নিয়ে রক্ষীবাহিনীকে ঠেকাবার চিন্তায় মগ্ন থাকলো কেন? শাফায়েত জামিলের কাছেই প্রথমে ছুটেগিয়েছিলেন রশীদ। “আমরা শেখ মুজিবকে হত্যা করেছি ” বলার পরও রশীদকে আটক করার চিন্তা করলেন না শাফায়েত জামিল। বরং পায়ে হেঁটে হেঁটে রশীদের সঙ্গে সেনা উপপ্রধান জিয়াউর রহমানের বাসায় গিয়ে হাজির হন ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার।
ফারুক -রশীদের আক্রমণ স্রেফ দুটি ইউনিটের একক দুঃসাহসিক অভিযান বলে প্রচার হলেও, ততোটুকু ‘একক’ ছিলনা। ফারুক ও রশীদ নিজেরাই বলেছে, আমাদের পেছনে সিনিয়ররা কেউ না থাকলে কিভাবে এতোবড় অভিযানে অগ্রসর হতে সাহস করতাম। ভীরুকাপুরুষ সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ শুধু নন, কর্নেল ফারুক ৭৬ সালেই বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলে, “জিয়াউর রহমানকে আমরা শেখ মুজিবকে উৎখাতের বিষয়ে অবগত করি। তিনি তখন বলেন, তোমরা জুনিয়ররা কিছু করতে চাইলে করো তখন দেখা যাবে। সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ অভিযোগ করেন সেনাউপপ্রধান জিয়া শুধু অনুমান নয়, ১৫ আগস্ট সম্পর্কে সব কিছু জানতেন। ভোর ছয়টার দিকে সিজিএস খালেদ মোশাররফকে পাঠানো হয়েছিল হেড কোয়ার্টারে, শাফায়েত জামিলকে তাড়া দেয়ার জন্য। খালেদ মোশাররফ সেখান থেকে শফিউল্লাহকে জানান ‘স্যার, ওরা আমাকে আসতে দিচ্ছে না। কিছু বলতেও দিচ্ছে না।
এসব কিসের ইঙ্গিত বাহক?
বিস্ময়কর যে, জুনিয়র অফিসারদের দ্বারা এরকম সরকার পরিবর্তনকারী অভ্যুত্থান রাজনৈতিক ইতিহাসে কল্পনা করা যায়না। গুটি কয়েক জুনিয়র অফিসার ও মাত্র দুটি ইউনিটের অভিযানে একটা সরকারের মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দিলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো এতবড় কালজয়ী নেতার নেতৃত্বাধীনে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা একটি মাত্র আঘাতে তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ে। তাঁর সৃষ্ট রক্ষীবাহিনী, পুলিশ বিডিআর কিছুই এগিয়ে গেলো না।
মেজর ডালিম উন্মুক্ত স্টেনগান নিয়ে সেনাপ্রধানের রুমে ঢুকে, কিন্তু হেড কোয়ার্টারে তাকে ঘেরাও করার কেউ ছিল না। বরং শফিউল্লাহকেই নতজানু হতে হয়।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018