শনিবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৯, ০৭:৩৫ অপরাহ্ন

এডিস মশা বৃদ্ধির পেছনেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

এডিস মশা বৃদ্ধির পেছনেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

অনলাইন ডেস্ক : অস্ট্রেলিয়া থেকে লাওস, সিঙ্গাপুর থেকে ফিলিপাইন- সমুদ্রবেষ্টিত এসব দেশ চলতি বছরে ব্যস্ত সময় পার করছে ডেঙ্গুর প্রকোপ ঠেকাতে। মশাবাহী এই ভয়ঙ্কর রোগের রাশ টেনে ধরতে বাংলাদেশের মতোই গলদঘর্ম ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং এমনকি চীনের মতো পরাশক্তিও। ঢাকায় মাত্র সাড়ে চার মাসের ব্যবধানে ডেঙ্গুর ঘনত্ব বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ গুণ। অন্তত চারটি কারণ এখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

এসব কারণের মধ্যে রয়েছে- জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব, সরকারি-বেসরকারি অধিকতর নির্মাণযজ্ঞ, সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব এবং মশাশিকারি কীটপতঙ্গের বিলুপ্তি।

২০১৭-১৮ সালে বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে গিয়েছিল। বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থাকে অবাক করে চলতি বছর তীব্র আকারে বেড়েছে এ রোগ। ফিলিপাইন শেষ পর্যন্ত এটিকে ‘জাতীয় মহামারি’ ঘোষণা করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে দেখা যাচ্ছে, গত মার্চে যেখানে ঢাকায় প্রাপ্তবয়স্ক মশার ঘনত্ব ছিল ৩৬, জুলাইয়ের শেষদিকে সেটি উন্নীত হয়েছে ৪৮৭-তে। এডিস মশার লার্ভাও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। লার্ভা বেড়ে যাওয়ায় নিকট ভবিষ্যতে এডিস মশার পাশাপাশি ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গবেষণামতে, ১৯৭০ সালের আগে ডেঙ্গুর অস্তিত্ব ছিল মাত্র নয়টি দেশে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে সেটি গিয়ে ঠেকেছে ১০০টিরও বেশি দেশে। বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকিতে রয়েছে।

ছোট পতঙ্গ হলেও মশা পৃথিবীর অন্যতম ঘাতক প্রাণী। সহজেই রোগ বহন এবং ছড়িয়ে দেওয়ার অসীম ক্ষমতা রয়েছে এদের। এদের প্রজননক্ষমতা নিয়ন্ত্রণও কষ্টসাধ্য। আর মশাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো এডিস মশা। ডেঙ্গু ছাড়াও জিকা ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের জন্য এ মশা দায়ী।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : বাংলাদেশের পাশাপাশি চলতি বছর ডেঙ্গু বিস্তৃত হয়েছে এমন দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া, চীন, লাওস, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম। অর্থাৎ আক্রান্ত প্রায় সব দেশই হয় সমুদ্রবেষ্টিত কোনো দ্বীপ কিংবা সমুদ্র তীরবর্তী রাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, উষ্ণায়ন, অতিরিক্ত নগরায়ন এবং পানির উষ্ণতা এডিস মশার দ্রুত বংশবিস্তারের প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, উষ্ণ তাপমাত্রার দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ডেঙ্গু ভাইরাসের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম।

আইসিডিডিআর’বির জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ড. কামরুন নাহার বলেন, ভেক্টর-বর্ন ডিজিসের বিশেষত্ব হলো মাধ্যম। এ ক্ষেত্রে মাধ্যম হলো এডিস মশা। মানুষের শরীর থেকে রক্ত আহরণের পর এডিস মশা স্বচ্ছ জলাশয়ে ডিম পাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি। ফলে যে জলাশয়ে এডিস মশা ডিম পাড়ে, সেটিও উত্তপ্ত থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের পরিবেশে এডিস মশার লার্ভা স্বাভাবিকের চেয়েও কম সময়ে পরিপূর্ণ মশার অবয়ব পায়। তিনি বলেন, উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় মশা মানুষের শরীর থেকে বার বার রক্ত নিতে চায়। এর ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে।

আইসিডিডিআর’বির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে কলেরা, ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু জ্বরের মতো মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখছে জলবায়ু পরিবর্তন। ন্যাচার মাইক্রোবায়োলজির এক গবেষণায় একই ফল পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে হঠাৎ করে বহু মানুষ চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এ জন্য কেউ প্রস্তুতও ছিল না। এ ভাইরাসের বিস্তারও ঘটে এডিস মশায়। চিকুনগুনিয়ার পর এ বছর ডেঙ্গুর বিস্তার এ দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত।

মশাশিকারি কীটপতঙ্গ বিলুপ্তির পথে : মশা খাওয়া পাখিগুলোর মধ্যে বেগুনি মার্টিন, গিলে, গিজ, টেনস, হাঁস অন্যতম। সাধারণত এই শিকারিরা প্রাপ্তবয়স্ক এবং জলজ (লার্ভা) উভয় পর্যায়ের মশা খেতে অভ্যস্ত। বেগুনি মার্টিন পৃথিবীতে মশা খাওয়ার জন্য বেশি পরিচিত। এ ছাড়া মশার অন্যতম শিকারি বাদুড়। উইসকনসিন ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক আবাসে বাদুড়রা অনেক বেশি মশা খায়। ট্যাডপোলস ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাঙ প্রচুর মশা এবং তাদের লার্ভা খায়।

তবে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ঢাকার পাশাপাশি এ দেশের অন্যান্য শহরেও এ ধরনের পাখি বা কীটপতঙ্গ নেই। গ্রামেও নানা কারণে অনেক প্রজাতির কীটপতঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিছু পতঙ্গের বিচরণ থাকলেও সংখ্যায় অনেক কমে গেছে। ফলে মশার বংশবিস্তার ঘটছে নির্বিঘ্নে।

লার্ভার আবাস নির্মাণকাজের সাইট : রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণযজ্ঞ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। উত্তরা থেকে মিরপুর-আগারগাঁও-ফার্মগেট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত একযোগে কাজ চলছে মেট্রোরেল স্থাপনের। এই উন্নয়নযজ্ঞের কারণে অনেক কৃত্রিম জলাধার বা গর্ত দেখা দিয়েছে। এসব স্থানে এডিস মশার লার্ভা ঠাঁই নিয়ে নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠছে।

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত কলকারখানার পাশাপাশি বাড়িঘর বানানোর জন্য নির্মাণকাজ হচ্ছে। এসব নির্মাণ সাইটের চৌবাচ্চা এবং ড্রামে এডিস মশার লার্ভা আবাস গড়েছে বলে ধারণা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার।

নজরদারির অভাব : এবার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাকাল অবস্থায় রয়েছে। এখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারায় নানামুখী সমালোচনাও হচ্ছে। সংশ্নিষ্টদের নজরদারির অভাবেই নীরবে ডেঙ্গু মশা এত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে বলে ধারণা অনেকের।

এ প্রসঙ্গে লন্ডনে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ ছিটিয়েছে নালা-বস্তিতে। কিন্তু এডিস মশা বংশবিস্তার করেছে বাড়িতে কিংবা উন্নত স্থানে জমে থাকা পানিতে, যেখানে ওষুধ পৌঁছায়নি।

আইসিডিডিআর’বির জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ড. কামরুন নাহার বলেন, বৃষ্টি হলেই যেখানে-সেখানে পানি জমে। নির্মাণকাজের সাইটে, বাড়িতে ফুলের টব কিংবা ড্রামেও পানি জমে যায়। যেদিকে মশার ওষুধ প্রয়োগকারীদের নজর থাকে না। ফলে একদম নীরবে নির্বিঘ্নে সেসব জায়গায় এডিস মশা বাড়তে থাকে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018