শনিবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৯, ০৭:০৪ অপরাহ্ন

কাশ্মীর ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে যা বললেন গোলাম মাওলা রনি

কাশ্মীর ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে যা বললেন গোলাম মাওলা রনি

অনলাইন ডেস্ক : সম্প্রতি কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। আর এ বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে গোটা ভারতে। কাশ্মীর ইস্যুতে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তার সেই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে কিছু বক্তব্য রেখেছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। ভিডিও থেকে তার সেই কথাগুলো পাঠকদের জন্য হুবুহু তুলে ধরা হল-

সম্মানিত দর্শক, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বরকাতুহু। আপনারা জানেন যে বাংলাদেশ সরকারের যে সচিবালয় আছে, সেই সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নামে একটা মন্ত্রণালয় আছে। এবং সেই মন্ত্রণালয়ে একটা মন্ত্রীর চেয়ার আছে। সেই চেয়ারে ইদানিংকালে যে ভদ্রলোক বসেন, তাকে আপনারা অনেকেই চেনেন বা তার নামও জানেন। তিনি কিভাবে মন্ত্রী হয়েছেন, কিভাবে ওই চেয়ারে বসেন, সেটা আমার মতো আপনারাও দেশবাসী ওয়াকিবহাল আছেন, ওই ব্যাপারে আমার কোনো কিছু বলা নাই।
কিন্তু সাম্প্রতিককালে তিনি যে একটি কথা বলেছেন, একটি বক্তব্য দিয়েছেন যেটা পত্রপত্রিকায় এসছে, আমার কাছে মনে হচ্ছে বিবেকের তারনা থেকে এ বিষয়টা নিয়ে কোন কিছু না বললেই নয়। সেই কারণ হল তিনি যে সাম্প্রতিক সময়ে পাক-ভারত উপ-মহাদেশসহ সমস্ত মুসলিম বিশ্বে এবং পৃথিবীতে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে যে উত্তেজনা চলছে, সে উত্তেজনায় সব আশঙ্কা করছে যে, যেকোন মুহূর্তে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। এবং যখনই এই যুদ্ধটি কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে আসবে, সঙ্গত কারণে সেখানে মালয়েশিয়া, তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তানসহ অন্যান্য মুসলমান বিশ্ব এমনকি সৌদি আরবও দৃশ্যতো হোক অদৃশ্যতো হোক, গোপনে হোক প্রকাশ্যে হোক, পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি না আসলেও কাশ্মীরি মুসলমানদের সাহায্যের ব্যাপারে বাধ্য থাকবে নিজ দেশের জনগণের চাপের কারণে। এবং এটাই ধ্রুব সত্য।

এর কারণটা হলো ১৯৪৭ সালের পর থেকে জম্মু এবং কাশ্মীর যে এলাকাটি সেটি ভারতের এলাকা নয়। সেটি একটি দখল করা একটা এলাকা এবং সবাই বলে আসছে এটা একটা অবৈধ দখল, যেভাবে আমরা সারা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষ মনে করি যে ফিলিস্তিনের মাটিতে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি যে জবরদখল করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে আমাদের পাক-ভারত উপ-মহাদেশের এই জম্মু এবং কাশ্মীর এলাকাটির ৮৬ পার্সেন্ট মুসলমানের সমস্ত অধিকারকে পায়ের নিচে, বুটের নিচে চাপা দিয়ে শুধুমাত্র প্রতারণা চক্রান্ত এবং রাষ্ট্র শক্তির কলাকৌশল ব্যবহার করে সুদীর্ঘকাল যাবত সেটাকে দখল করা হয়েছে। এবং সেই দখলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যাবত সেই ৪৭ থেকে আজ অবধি একের পর এক সংগ্রাম করে কত হাজার যে মানুষ মারা গেছেন, কত মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছেন, কত মানুষ জেল খাটিয়েছেন, একটা অমানবিক দৃশ্য।

একটা সামন্ততান্ত্রিক নয় একটা স্বৈরতান্ত্রিক দেশের একটা অগণতান্ত্রিক আচরণ। সেই ভারত সাম্প্রতিককালে তাদের সেই অতীত মনোবৃত্তিটাকে একেবারে উলঙ্গ করে দিয়ে কাশ্মীরকে পরিপূর্ণভাবে দখল করার জন্য তাদের সংবিধানের যে দুটো ধারা ছিল একটা ৩৭০ আর্টিকেল এবং ৩৫এর (ক) ধারা, যার মাধ্যমে মূলত কাশ্মীরকে আইনগতভাবে কাগজে কলমে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। ঠিক সেই সুযোগ-সুবিধাটা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং কাশ্মীরকে এখন দুটো ভাগে ভাগ করে কেন্দ্রীয় সরকারের আন্ডারে নিয়ে আসা হয়েছে এবং অন্যান্য রাজ্যের যে সুযোগ-সুবিধাগুলো আছে, যেমন পশ্চিমবঙ্গ, নাগাল্যন্ড, মেঘালয়, আসাম, এদের চাইতেও আরো খারাপ অবস্থায় কাশ্মীরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তো এই অবস্থাতে ভারত ও পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে এবং সবাই বোঝে যে এখানে একটা যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। এবং সেই যুদ্ধ যদি লেগে যায় তাহলে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে সেটি এই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চেয়ারে বসা ভদ্রলোক একটা অদ্ভুত এবং আজগবি কথা বলে ফেলেছেন। উনি বলেছেন যে, যদি যুদ্ধ লাগে কাশ্মীর নিয়ে তাহলে আমরা ভারতের পক্ষে অবস্থান নিব।

এটা কী ধরনের কথা? আমি ওই ভদ্রলোককে প্রশ্ন করতে চাই আপনার লেখাপড়ার মান কোন পর্যায়ে আছে? আপনি কী সংবিধান পড়েননি? আপনি জানেন যে একটা যুদ্ধ যখন হয় কোনো পারস্পারিক দেশের মধ্যে, সেখানে অন্য একটি দেশকে যদি যুদ্ধে জড়াতে হয়, কিংবা অন্য একটি দেশকে যদি যুদ্ধে সমর্থণ দিতে হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে প্রত্যেকটা রাষ্ট্রের কতগুলো মৌলিক নীতিমালা আছে। সে নীতিমালা কী? সে নীতিমালা কী আপনি? আপনি কোন অধিকারে কোন সাহসে এবং কোন এখতিয়ারের বলে এটা বললেন?

আমাদের দেশের আসলে এখন গণতান্ত্রিক অবস্থা খুব দুর্বল অবস্থায় আছে। বিভিন্ন সমস্যার কারণে জর্জরিত হয়ে আছে, ফলে কথাটার গুরুত্ব কেউ বুঝতে পারেনি।

যদি বুঝতে পারতো এবং দেশ যদি স্বাভাবিক থাকতো তাহলে ওই ভদ্রলোক ওই চেয়ারে পাঁচ মিনিটও বসে থাকতে পারতেন না। এটি অত্যান্ত একটা গর্হিত একটা কথা উনি বলেছেন, রাষ্ট্রবিরোধী কথা বলেছেন, দেশবিরোধী কথা বলেছেন। কেননা এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের জনগণ, গণভোট, দেশের সেন্টিমেন্ট, আবেগ, অনুভূতি অনেক কিছু জড়িত। এটার বাইরে কেউ কোনো গোষ্ঠী কোনো স্বার্থবাদী কায়েমি, দালাল কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের এজেন্ট ইচ্ছে করেও এই যুদ্ধের ব্যাপারে বাংলাদেশকে কোন পক্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না।

আমরা ন্যায়ের পক্ষে থাকবো, আমরা সত্যের পক্ষে থাকবো। আমরা আমাদের এ দেশের যে আপামর জনগণ, সে জনগণ যা চায় সেই দিকেই থাকবো এবং সেই ব্যাপারে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি জনগণ, বাঙালি জাতির ঐতিহ্যগত অনুযায়ী আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আমাদেরকে নিয়ে চক্রান্ত করে অতীতে যেভাবে পারেনি, আগামী দিনগুলোতেও পারবে না। কাজেই আপনি যে কথাগুলো বলেছেন সে কথাগুলো খুব দ্রুত আপনি সংশোধন করুন, ক্ষমা প্রার্থণা করুন এবং শিখুন, রাজনীতি শিখুন এবং কী করে কথা বলতে হয় তা জেনে নিন এবং আপনি যার অধিনে কর্ম করছেন, আপনার এ কথা দ্বারা তার ভবিষৎ আর নষ্ট করবেন না এবং তাকে বিতর্কিত করবেন না।

কারণ আপনাকে ওই পদে বসানো হয়েছে তার হুকুম আহকাম পালন করার জন্য, তার ব্যক্তিগত সুনাম সুখ্যাতি বাড়ানোর জন্য। কিন্তু তাকে ক্ষতি করার জন্য নয়। কিন্তু আপনি যে কথাটি বলেছেন এটা মূলত আপনার দল এবং আপনার নেত্রী, উভয়কেই বতর্কিত করার একটা সুযোগ এসে গেছে ইসলামপন্থিদের কাছে, অনেকের কাছে।

কাজেই আপনি ফিরে আসুন, আপনি সত্য কথাটা বলুন। যেটি আসলে বলা উচিত। আপনার সুমতি হোক, সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও, দেশের প্রতি যেন আল্লাহ রব্বুল আলামিন যেন খাস রহমত এবং বরকত নাজিল হয়, কেননা আমরা এই কাশ্মীর সংক্রান্ত সম্যাসা আছে সেটা যেভাবেই হোক না কেন এ সমস্যা সামাল দেওয়ার মতো শক্তি আমাদের নেই। এই সমস্যা জড়ানোর মতো শক্তি-সামর্থ নেই, এই সমস্যা মোকাবেলার মতো প্রজ্ঞা মেধা কোনটাই আমাদের নেই। কাজেই আমরা এর মধ্যে জড়াবো না, আমরা আমাদের অবস্থান, আমাদের হাজারো সমস্যা, আমরা মশার সাথে পারছি না, আমরা একটা ডেঙ্গুর ভয়ে অস্থির হয়ে আছি, আমাদের হাজার হাজার একর জমি এই বন্যার তোরে নদীতে ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে, আমরা নদীর তীরটা ঠিক মতো রক্ষা করতে পারছি না। আমাদের দেশে ভালোভাবে চোখের অপারেশন করার মতো একটা হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। একটা ভিভিআইপি আমাদের রাষ্ট্রপতির মতো একজন সম্মানিত মানুষের মেডিকেল চেকআপ করার মতো আমাদের দেশে এখনো কোন হাসপাতাল আমরা তৈরি করতে পারিনি। তাই আমরা সেখানে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলে কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ হলে ভারতের পক্ষে অবস্থান নিব, এরকম বেকুবের মতো কথা বলে আমরা আমাদের বর্তমান সমস্যাগুলোকে আরো বাড়িয়ে তুলবো এটা হতে পারে না। আপনি চাইলেও হবে না, জনগণ যা চাইবে তাই হবে।

আপনারা সবাই ভালো থাকুন, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বরকাতুহু।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018