শনিবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৯, ০৭:৪৬ অপরাহ্ন

শরৎ সূচনা আজ

অনলাইন ডেস্ক : শ্রাবণ শেষে আজ শুক্রবার ভাদ্রের প্রথম দিন। শরৎ ঋতুর সূচনা। পঞ্জিকার হিসাব অনুসারে বর্ষা চলে গেলেও রয়ে গেছে বাস্তবে; বিদায় নেয়নি। দু-একদিন বাদেই বৃষ্টি থেমে থেমে ঝরছে অঝোর ধারায়। সেই সঙ্গে তালপাকা গরম। মাঝেমধ্যে নীল আকাশে সাদা তুলোর মতো মেঘ উড়ে বেড়ায়। এরই মাঝে বদলে গেছে প্রকৃতি। নদীর কূল ঘেঁষে কাশের গুচ্ছ। মৃদুমন্দ বাতাসে দোল খাচ্ছে। প্রকৃতিপ্রেমীরা সময়টা দারুণ উপভোগ করতে ছুটছেন নদী কিংবা খাল-বিলের কিনারে। প্রিয় ঋতুর রঙ-রূপে নিজেকে খুঁজছেন কবিরা, শিল্পীরা। শিউলি ফুলের গন্ধমাখা স্নিগ্ধ ভোর পেতেও তারা ছুটছেন গ্রামে কিংবা রাজধানীর আশপাশের সবুজ অরণ্যে। কারণ যান্ত্রিক এই নাগরিক জীবনে শিউলি ফুলের উপস্থিতি নেই বললেই চলে।

মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আশ্বিনের মাঝামাঝিতে ঢাকের বাজনা দিয়ে শারদীয়র সূচনা হয়। ঋতু অনুসারে ভাদ্র-আশ্বিন মাসজুড়ে শরৎকালের রাজত্ব। শরৎকাল এলেই গ্রামবাংলার ঝোপঝাড়, রাস্তাঘাট ও নদীর দুই ধারসহ আনাচে-কানাচে মন মাতানো নাচানাচি দেখা যায় কাশফুলের। অজান্তেই তখন ভিন্ন রকম আনন্দের ঝিলিক বয়ে যায় মানুষের মনে। কাশফুল শারদীয়কে পূর্ণতা প্রদান করে। শরৎ শুভ্রতার ঋতু। শরৎ মানেই স্নিগ্ধতা। তাই তো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রিয় শরৎকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা-/নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা/এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,/এসো নির্মল নীলপথে…’। কবিগুরুর বর্ণনার সঙ্গে এখন মিলে যায় সব। কাশফুল শেফালিমালা নবীন ধানের মঞ্জরী এখন দৃশ্যমান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গ্রামে তো বটেই, রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তেও এমন দৃশ্য দেখা যায়। ফুটেছে সুগন্ধী শিউলিও। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে শিউলি ফুল খুব আকৃষ্ট করেছিল। শরৎ দেখতে গিয়ে শিউলি আর শিউলি দেখতে গিয়ে শরৎ দেখেছেন তিনি। মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন, ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি-বিছানো পথে।/এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে…’। অন্যত্র কবির উচ্চারণ- ‘শিউলিতলায় ভোর বেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।/শেফালি পুলকে ঝ’রে পড়ে মুখে খোঁপাতে চিবুকে আবেশ-উতলা…’।

আকাশেও শরতের রঙ-রূপ। সেই রঙ-রূপের দিকে তাকালে চোখ মুগ্ধ হয়, মন ভরে যায়। গ্রামের সবুজ বন চিরহরিত বৃক্ষের ফাঁক দিয়ে কী সুন্দর আকাশ দেখা যাচ্ছে! যান্ত্রিক শহরের বহুতল ভবনের ভিড়েও দিব্যি চোখে পরে নীল আকাশ। কবিগুরুর ভাষায়- আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা-/নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই- লুকোচুরি খেলা…’।

শরৎ শুধু প্রকৃতিতেই পরিবর্তন আনে না, বদলে দেয় মানুষের মনও। সেই পরিবর্তনের কথাও কবিগুরুর কাব্যে রয়েছে। সেসব পরিবর্তনের কথা জানিয়ে কবিগুরু লিখেছেন- ‘শরতে আজ কোন্‌ অতিথি এল প্রাণের দ্বারে।/আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা রে…’তার মানে, আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসে শরৎ। মনকে ভরিয়ে রাখে। নাকি কিছু লুকোনো বেদনাও তুলে আনে হৃদয় খুঁড়ে? তা না হলে নজরুল কেন লিখবেন- ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথী কই…’। একই রকম বিরহের প্রকাশ ঘটিয়ে অন্যত্র কবি লিখেছেন- ‘দূর প্রবাসে প্রাণ কাঁদে আজ শরতের ভোর হাওয়ায়।/শিশির-ভেজা শিউলি ফুলের গন্ধে কেন কান্না পায়…’। আকুতি শোনা যায় কবিগুরুর কণ্ঠেও। তিনি লিখেন-// ‘আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে কী জানি পরান কী যে চায়।/ওই শেফালির শাখে কী বলিয়া ডাকে বিহগ বিহগী কী যে গায় গো…’।

শরতের আভাস স্পষ্ট করে পেতে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী মাস আশ্বিন পর্যন্ত। এই ঋতুর বন্দনায় শান্তিনিকেতনে বিশেষ উৎসবের আয়োজন করতেন কবিগুরু। এখন অনেক কিছুই বদলে গেছে। তবে শরৎ-বন্দনা থেমে নেই। প্রতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে শরৎ উৎসবের আয়োজন করা হয়। একই রকম আয়োজন থাকে চারুকলার বকুলতলায়।

প্রকৃতিবিষয়ক সংগঠন ‘তরুপল্লব’-এর সাধারণ সম্পাদক ও প্রকৃতিবিষয়ক গবেষক মোকারম হোসেন সমকালকে বলেন, ‘শরৎ-এর ফুল মূলত তিনটি- কাশ, শিউলি ও দুই রঙ-এর পদ্ম (সাদা ও গোলাপি)। এ ছাড়া শরতের শেষদিকে ফোটে ছাতিম ফুল। তবে ছাতিম ফুল শরৎ ও হেমন্তের মাঝামাঝিতেই বিকশিত হয়। আরও ফোটে কলমি ফুল। কৃৃষ্ণচূড়াও ফোটে। তবে বর্ষার শেষদিকে আর শরৎ-এর শুরুতে বর্ষার জমে থাকা পানি কমে যাওয়ায় জলজ ফুলগুলোর সৌন্দর্য বিকশিত হয়। এ সময়ের ফুলের মধ্যে রয়েছে হলুদরঙা সোনাইল বা বান্দরলাঠি, বিলিতি জারুল, শ্বেতকাঞ্চন, এলামেন্ডা, কামিনী, মাখনা, দইগোটা ও চা-ফুল তো আছেই। দু’চারটি গন্ধরাজও থাকবে। ফুরুসও (চেরি) থাকবে এই সময়টায়। ফলের মধ্যে রয়েছে আমলকী ও জলপাই।’

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © bdbulletin.com 2018